Tuesday, 26 April 2011

দুদক এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সটেনশন










এম এ নোমান
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার স্বাধীনসত্তা হারিয়ে এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সটেনশনে পরিণত হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও অপর দুই সদস্য এক সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই কর্মরত ছিলেন। এই কর্মকর্তারা সে সময় বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। মামলা দায়ের, অভিযোগ অনুসন্ধান ও সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি পাঠানোর ক্ষেত্রে দুদক নিজস্ব এখতিয়ার প্রয়োগের পরিবর্তে এখন সরকারের শীর্ষমহলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করছে। দুদকের যে আইনটি সম্প্রতি সংশোধন করে সংসদে পেশ করা হয়েছে তা পাস হলে প্রতিষ্ঠানটি একেবারেই একটি তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। দুদক সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এ চিত্রই পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমান স্বয়ং দুদক সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি একটি দন্তহীন বাঘ, এখন এর নখগুলোও কেটে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুদক তার নিজস্ব এখতিয়ার প্রয়োগ করে কোনো সময়েই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। তারা বলেন, সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদের নেতৃত্বে দুদক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাই সরকারের শীর্ষমহলের নির্দেশনার আলোকেই দুদকের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরোধীদলীয় নেতাদের হয়রানি এবং ক্ষেত্রবিশেষ চমক সৃষ্টি ছাড়া সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি দমনে দুদক কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিনা টেন্ডারে শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ দলীয় লোকদের দেয়া এবং জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় দুদকের নীরবতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আইন যাই হোক দুদকের বর্তমান আজ্ঞাবাহী জনবল দিয়ে দুর্নীতি দমন হবে না বলেও মনে করেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সটেনশন : দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে তাকে ওই পদে নিযুক্ত করা হয়। লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদের বিদায়ের পর বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব গোলাম রহমানকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া দুদকের দুই সদস্য বিদায় নেয়ার পর গত মাসে মো. বদিউজ্জামান ও মো. শাহাবুদ্দিনকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মো. বদিউজ্জামানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি টানা এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন শেষে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। সদ্যনিযুক্ত দুদকের অপর সদস্য মো. শাহাবুদ্দিনকে বর্তমান সরকার ‘আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘুদের ওপর বিএনপিসহ চারদলীয় জোট কর্তৃক পরিচালিত জুলুম-নির্যাতনের ঘটনা’ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ নির্দেশে ২০০১ সালে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার সারাদেশে আওয়ামী লীগ এবং হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘুদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ এনে ওই ঘটনা তদন্তে তাকে দিয়ে এক সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি বিএনপির দশ হাজার নেতাকর্মীকে দায়ী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশ করেছে।
চেয়ারম্যানসহ তিন সদস্যবিশিষ্ট দুদকের সবাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠান : আইনে দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দুদকের কোনো সময়েই ছিল না বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। দুদক বরাবরই ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই এর যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য। বর্তমান দুদক আইন সংশোধন করে এটিকে সরকারের একটি তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার আগে প্রত্যক্ষভাবে দুদককে নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন প্রত্যক্ষভাবেই এর নিয়ন্ত্রণ সরকার গ্রহণ করতে যাচ্ছে। বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের অবস্থায় থাকা দুদক (সংশোধনী) আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন ও সংযোজন করে বিচারক, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ আবশ্যক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুদকের দায়ের করা যে কোনো মামলা তদন্তের জন্য দুদকের একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে পুলিশ ও সরকারের অন্যান্য সংস্থার হাতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও দুদকের সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে সরকার। দুদকের সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনায় সচিবই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। সচিব যদি সরকার নিয়োগ দেয়, তাহলে এর কার্যক্রমও সরকারই নিয়ন্ত্রণ করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া দুদকের ২০০৪ সালের আইনের ২০ (১) ধারায় বলা হয়েছিল, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন ও এর তফসিলে বর্ণিত অপরাধসমূহ কেবলমাত্র কমিশন কর্তৃক তদন্তযোগ্য হবে। একই ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে যে, অপরাধসমূহ তদন্তের জন্য কমিশন, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এর অধস্তন কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করতে পারবে। এ ধারাটি সংশোধন করে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তদন্তের বিষয়ে একই ধারার (২) উপ-ধারায় বলা হয়েছে যে, উপধারা (১)-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, উক্ত উপ-ধারায় উল্লিখিত অপরাধসমূহ তদন্তের জন্য কমিশন, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এর অধস্তন কোনো কর্মকর্তা, পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থাকে ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবে। (৩) উপ-ধারায় বলা হয়েছে যে, উপ-ধারা (১) ও (২)-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ আইন ও তফসিলে উল্লিখিত কোনো অপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার তদন্তের জন্য কমিশন, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কেবল পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থাকে ক্ষমতা অর্পণ করবে। ২০০৪ সালের আইনে দুদককে অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য দেশের সব নাগরিকের বিরুদ্ধে একই পদ্ধতিতে মামলা করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল। ‘আইন সবার জন্য সমান’ বলা হলেও দুদকের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ৩২ ধারার পর ৩২ক নামে একটি পৃথক ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭-এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় বলা হয়েছে—যখন দণ্ডবিধির ১৯ ধারার অর্থানুসারে কোনো জজ অথবা কোনো ম্যাজিস্ট্রেট অথবা সরকার কর্তৃক সরকারের অনুমোদন ব্যতীত অপসারণযোগ্য নয়—এ ধরনের কোনো সরকারি কর্মচারী তার দায়িত্ব পালনকালে অথবা দায়িত্ব পালনে আসীন বলে বিবেচিত হওয়াকালে কোনো অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তখন সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো আদালত ওইরূপ অপরাধ আমলে আনবেন না। একই ধারার ২ নং উপধারায় বলা হয়েছে—ওই জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারী অপরাধ বা অপরাধসমূহের অভিযোগ কার দ্বারা বা কীভাবে করা হবে, সরকার তা নির্ধারণ করতে পারবে এবং কোন আদালতে বিচার হবে, তাও নির্দিষ্ট করে দিতে পারবে। দুদক আইন সংশোধনের ব্যাপারে প্রবল আপত্তি জানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান আমার দেশকে বলেন, এটা হলে দুদকের স্বাধীন সত্তা বলে যা ছিল, সেটা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হবে। বর্তমান সরকারের সময় দলীয় লোকদের কোটি টাকার কাজ দেয়া, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের নামে শত শত কোটি টাকার কাজ পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে দেয়া এবং শেয়ার জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুদকের নীরবতার বিষয়ে টিআইবি চেয়ারম্যান বলেন, সদিচ্ছা থাকলে দুদক এসব বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারত। মূলত আইন, অবকাঠামোগত অসুবিধা ও জনবল সঙ্কট, সর্বোপরি স্বাধীন সত্তা না থাকায় দুদক স্বাধীনভাবে কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুদকের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে বিদ্যমান আইন শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন মানসিকতাসম্পন্ন লোকবলেরও প্রয়োজন হবে।
বিরোধী রাজনীতিকদের হয়রানির হাতিয়ার : দুদক মূলত বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সেনা সমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গোটা দু’বছরই দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের দেয়া তালিকা অনুযায়ী দেশের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। দুদক স্বাধীন হলেও এর সচিব, মহাপরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ের সব কর্মকর্তাই সরকার কর্তৃক নিযুক্ত। কাজেই সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই মামলা দায়ের এবং এর তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে দুদক। বর্তমান সরকারের সময় এসেও দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। দুদক চেয়ারম্যানের পদ থেকে লে. জেনারেল হাসান মশহুদের পদত্যাগের পর চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন সাবেক সচিব গোলাম রহমান। এর পরপরই সরকার দুদক আইনও সংশোধনের উদ্যোগ নেয়।
বর্তমান সরকারের দু’বছরেও দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে জানান দুদকেরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে যে ক’টি মামলা হয়েছে, তার সবগুলোই বিরোধী দল ও মতের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। অথচ বর্তমান সরকারের সময়ে টেন্ডার নীতিমালা পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের সরকারি কাজগুলো কোনো অভিজ্ঞতা ও জামানত ছাড়াই সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দেয়া হচ্ছে। পিপিআর পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কোনো টেন্ডার ছাড়াই রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করার কাজ দেয়া হচ্ছে। এগুলো সবই সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা পেয়েছেন। এতে করে দেশব্যাপী দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ছড়িয়ে পড়লেও দুদক মামলা করা তো দূরের কথা, অনুসন্ধান করারও সাহস দেখাতে পারছে না। অপরদিকে বিরোধী দল ও মতের লোকদের নামে এ সরকারের সময়ই দুদক শতাধিক মামলা দায়ের করেছে।
ভূমিকা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত : দুদকের ভূমিকার বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিশিষ্ট ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আমার দেশকে বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দমনের ক্ষেত্রে দুদক সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত দু’বছরে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত যে ক’টি মামলা হয়েছে, তার সবগুলোই বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের নামে। অথচ ওয়ান-ইলেভেন সরকারের হর্তাকর্তাদের বিষয়ে দুদক একবারেই নীরব। এছাড়াও গত দু’বছরেই দেশে দুর্নীতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। দু’লাখ টাকার স্থলে আট কোটি টাকার সরকারি কাজ বিনা টেন্ডারে দলীয় লোকদের দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও শত শত কোটি টাকার পাওয়ার প্লান্টের কাজ বিনা টেন্ডারে দেয়া হচ্ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয়েছে এবার শেয়ারবাজারে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে দুদক নীরব থেকে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে জাতিকে জানিয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন এবং ক্ষেত্রবিশেষে চমক সৃষ্টি ছাড়া দুদক দুর্নীতি দমনে কোনো কাজই করেনি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বর্তমানে দুদকে যেসব লোক নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের দ্বারা আর যাই হোক, দুর্নীতি দমন হবে না।
দুদকের বক্তব্য : দুদক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে—এ অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আমার দেশকে বলেন, আইনে আমাদেরকে যতটুকু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, ততটুকুই প্রয়োগ করে আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। সরকারের কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আমরা এখনও পর্যন্ত আমলে নেইনি। আইন সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, মূল আইনে বলা হয়েছে দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে। কাজেই আমরা আশা করছি সরকার এমন কিছু করবে না যাতে এ প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা খর্ব হয়। এটা হলে দেশে ও বিদেশে সরকারেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই নয়, এর পরের সরকারের সময়ও আমি একই দায়িত্ব পালন করেছি। গত দু’বছরে শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নামেই মামলা ও তদন্ত হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি নিয়ে কোনো মামলা না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, দুদকে জমা হওয়া অভিযোগগুলোই তদন্ত ও অনুসন্ধান করে যৌথভাবে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত হয়। এখানে সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল দেখা হয় না। দুদক সদস্য মো. বদিউজ্জামান বলেন, ২০০১ সালের পর থেকে আমি সরকারের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। দুদক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় এক মাস অতিবাহিত হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধানিষেধ পাইনি। আশা করছি আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পারব। অপর সদস্য মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা অনুসন্ধানের জন্য হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সে নির্দেশনা মেনেই আমি দায়িত্ব পালন করেছি। দুদক আইন সংশোধনীর বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ চায় দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করুক। কাজেই সরকারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না, যাতে দুদকের স্বাধীনতা খর্ব হয়।

ওএমএসে’র চাল কালোবাজারে : ক্ষমতাসীনরা হাতিয়ে নিচ্ছে ভর্তুকির কোটি কোটি টাকা












কাজী জেবেল
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় স্থানীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের গুদাম থেকে খোলাবাজারে বিক্রির (ওএমএস) প্রায় দুই হাজার বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। এসব চাল কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয় বলে র্যাব জানায়। তিনি ওই এলাকার ওএমএসের ডিলার। এ ঘটনায় সাইদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলার নিকলীতে ওএমএসের চাল কালোবাজারে বিক্রির দায়ে পূর্বগ্রাম বাজারহাটি গ্রামের ডিলার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিনকে গত ৮ এপ্রিল জরিমানা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বোয়ালমাখালী উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ সেলিমকে চাল কালোবাজারের বিক্রির দায়ে গত ৭ এপ্রিল জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এভাবে প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোলাবাজারে বিক্রির জন্য বরাদ্দকৃত চাল কালোবাজারে বিক্রির সময় ধরা পড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলছে। তারা প্রভাবশালী হওয়াতে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিদিন কম হলেও শতকরা ১০ ভাগ চাল কালোবাজারে চলে যাচ্ছে। অর্থাত্ দৈনিক এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার কেজি চাল কালোবাজারে যাচ্ছে। এর সিংহভাগ ধরা পড়ে না। যা ধরা পড়ছে তা প্রকৃত পরিমাণের অনেক কম। এসব চাল স্থানীয় বাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়। এতে দরিদ্র মানুষের জন্য ওএমএস চালে সরকারের শত শত কোটি টাকা ভর্তুকির অনেকটাই আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে যাচ্ছে। এসব কাজে খাদ্য অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা বলেন, অবস্থা এমন হয়েছে যে লাভের গুড় পিঁপড়া খাচ্ছে।
খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক কালোবাজারে চাল বিক্রির কথা স্বীকার করে গতকাল আমার দেশকে বলেন, ওএমএস ও ফেয়ার প্রাইসের জন্য বরাদ্দকৃত চাল কালোবাজারে বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের এক ধরনের খারাপ প্রবণতা। বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় ডিলাররা নির্ধারিত চাল প্রতিদিন বিক্রি করতে পারছেন না। উদ্ধৃত চাল অনেকে কালোবাজারে বিক্রি করছেন। এসব রোধ করতে আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি তদারকি করছে। এসব কমিটিতে উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলীয় নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর পরও কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। আমরা সাধ্যমত কালোবাজারি ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। এ বিষয়ে লোকাল কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ওএমএস ও ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে আগামীতেও কম দামে চাল দেয়া হবে। এখন যারা সরকারি নিয়ম ভেঙে চাল বিক্রি করছে তাদের বাদ দিয়ে তখন নতুন ডিলার নিয়োগ দেয়া হবে।
খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আহমেদ হোসেন খান গতকাল আমার দেশকে বলেন, খোলাবাজারে চাল বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কালোবাজারে চাল বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। আমরা কালোবাজারি বন্ধে কঠোরভাবে মনিটরিং করছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চালের দামের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে খাদ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা মহানগরী এবং চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে খোলাবাজারে কম দামে চাল বিক্রি শুরু করে। জনপ্রতি ৫ কেজি হারে এ চাল দেয়া হয়। প্রতি কেজি চাল ২৪ টাকা। একই দামে ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে সারাদেশে প্রায় ৬৭ লাখ পরিবারকে চাল দেয়া হচ্ছে। ওএমএস কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার টন চাল বিক্রির জন্য ডিলারদের দেয়া হয়। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওএমএসের মাধ্যমে ৪ লাখ ৮৮ হাজার টন এবং ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে ২৩ হাজার টন চাল বিক্রি হয়েছে। এছাড়াও ২২ হাজার ৭০০ টন গম বিক্রি হয়েছে। ৬৬২টি খোলা ট্রাক ও ৭ হাজার ৬০০ জন ডিলার ওএমএসের চাল বিক্রি করেন। এক হিসাবে দেখা গেছে, আগে সংগ্রহ করা এসব চালের অর্থনৈতিক মূল্য প্রতি কেজি ২৭ দশমিক ৮০ টাকা। ডিলারদের দেয়া হচ্ছে ২২ দশমিক ৫০ টাকায়। ডিলাররা ১ দশমিক ৫০ টাকা লাভে তা ২৪ টাকায় বিক্রি করছেন, অর্থাত্ প্রতি কেজিতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৫ দশমিক ৩০ টাকা। তবে সম্প্রতি সংগৃহীত প্রতি টন চালের দাম পড়েছে ৫০৮ দশমিক ৪০ ডলার। অর্থাত্ প্রতি কেজির দাম কম-বেশি ৩৬ টাকা। এসব চাল বাজারে ছাড়া হলে প্রতি কেজিতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ দশমিক ৫০ টাকা।
তৃণমূল পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওএমএস চাল বিক্রির জন্য নিয়োগকৃত ডিলারদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ক্ষমতাসীন দলে থাকার সুবাদে অনেক অসাধু ডিলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি না করে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ২৪ টাকা দরের চাল এলাকাভেদে ৩০-৩২ টাকা দরে বিক্রি করেন তারা। এতে স্বল্পআয়ের মানুষ ন্যায্যমূল্যের চাল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের বেশি দামে বাজার থেকে চাল কিনতে হচ্ছে। অপরদিকে ক্ষমতাবান এসব ব্যক্তি দলীয় পরিচয় কাজে লাগিয়ে লাভবান হচ্ছেন। এক্ষেত্রে খাদ্য অধিদফতরের অনেক কর্মকর্তা তাদের সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ডিলার স্থানীয়ভাবে এত প্রভাবশালী যে স্থানীয় কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সাহস পান না। নাম গোপন রাখার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, তারা প্রশাসনের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে রাখেন। এ কারণে বাড়তি ঝামেলার আশঙ্কায় সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও কর্মকর্তারা অভিযানে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখান। এছাড়া কালোবাজারের চাল বিক্রির সময় যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করের ডিলাররা। তারা খাদ্য অধিদফতরের সিলসংবলিত বস্তা পাল্টিয়ে সাধারণ বস্তায় চাল পরিবহন করে। অনেকে সরকারি গুদাম থেকে চাল নিয়ে দালালদের মাধ্যমে সরাসরি বাজারজাত করে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পরা কয়েকটি ঘটনায় এসব চিত্র দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিন এলএসডি খাদ্যগুদাম থেকে ৬ মেট্রিক টন চাল উত্তোলন করার পরই এক মেট্রিক টন চাল দালালদের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মজুত পরীক্ষা করে এক মেট্রিক টন চল কম পান। খুলনার খালিশপুরে হাউজিং বাজারের একটি দোকান থেকে ৯২ বস্তা চাল জব্দ করা হয়েছে। দেশের অনেক জায়গা থেকে বিভিন্ন অবস্থায় শত শত বস্তা চাল কালোবাজারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ঢাকা মহানগরীর ৫৬ ডিলারের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। সারা দেশে কতটি ডিলার বাতিল এবং কতজনকে জরিমানা বা আটক করা হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা
।

লোহাগড়ায় আ’লীগ নেতার গুদাম থেকে ১০২ বস্তা গম আটক

ডেস্ক রিপোর্ট

নড়াইলের লোহাগড়ায় আওয়ামী লীগ নেতার গুদাম থেকে ১০২ বস্তা খাদ্য অধিদফতরের গম আটক করেছে উপজেলা প্রশাসন। চট্টগ্রামে ওএমএসের চাল কালোবাজারে বিক্রির দায়ে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ডিলারশিপ বাতিল করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এদিকে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে আটক করা ওএমএসের চাল জিআর’র চাল বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল এসব ঘটনা ঘটে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
নড়াইল : লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মিঠু মোল্যার গুদাম থেকে খাদ্য অধিদফতরের ১০২ বস্তা গম আটক করেছে উপজেলা প্রশাসন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুণ কুমার মণ্ডলের নেতৃত্বে মিঠাপুর বাজারে অভিযান চালিয়ে এ গম আটক করা হয়।
জব্দ করা গম স্থানীয় ব্যবসায়ী সফিয়ারের জিম্মায় নিয়ে গমসহ গুদামটি সিল করে দেয়া হয়েছে। লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুণ কুমার মণ্ডল জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মিঠু মোল্যার ভাড়া করা গুদাম থেকে কালোবাজারের জন্য মজুত করা খাদ্য অধিদফতরের ১০২ বস্তা গম আটক করা হয়েছে। এর প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি করে গম আছে। এ বিষয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চট্টগ্রাম : সরকারি ওএমএসের চাল গোপনে অন্যত্র বিক্রির অপরাধে এক আওয়ামী লীগ নেতার ডিলারশিপ বাতিল ও ৩৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার বোয়ালখালী উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডী বানুরটেক এলাকার ওএমএস ডিলার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. সেলিম বিভিন্ন সময় সরকারি বরাদ্দ ওএমএস চাল গোপনে অন্যত্র বিক্রি করে আসছিল। বিভিন্ন সময় এ ব্যাপারে তাকে হুশিয়ার করা সত্ত্বেও সে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। ফলে এলাকার লোকজন ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানায়নি।
এদিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলশাদ বেগম বানুরটেক এলাকায় গিয়ে ওএমএস ডিলার মো. সেলিমের দোকানে চালের গরমিল পান। এ ঘটনায় তাত্ক্ষণিকভাবে তার ডিলারশিপ বাতিল করে ৩৬ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ইউএনও জানান, স্টক মতে তার কাছে গতকাল সকাল পর্যন্ত ৪০ বস্তা চাল থাকার কথা। কিন্তু স্টক মিলিয়ে মাত্র ২৪ বস্তা পাওয়া গেছে। এতে প্রায় ৮০০ কেজি চাল কম পাওয়া যায়।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) : শিবালয় থানা পুলিশ উপজেলার জাফরগঞ্জ বাজারের একটি দোকান থেকে বুধবার সন্ধ্যায় ৩০ বস্তা ওএমএসের সিজ করা চাল গোপন সমঝোতার মাধ্যমে জিআরের চাল বানানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ চাল নিয়ে শিবালয় থানা পুলিশ ও সরকারি খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
শিবালয় থানার এএসআই মনিরুজ্জামান জানান, চাল ব্যবসায়ী মো. আবদুল আওয়াল ওএমএসের চাল বিক্রি করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে তার দোকানে তল্লাশি চালালে ৩০ বস্তা সিদ্ধ চাল পাওয়া যায়। তখন ওই ব্যবসায়ী চালের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তাই ওই চাল সিজ করে পুলিশের জিম্মায় রাখা হয়। পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে চালের যাবতীয় কাগজপত্র দেখানোর সময় বেঁধে দেয় হয়।
চাল ব্যবসায়ী মো. আবদুল আওয়াল জানান, উথুলী গ্রামের জনৈক ফারুক দৌলতপুর উপজেলার কোলা গ্রামের পূর্বপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি লুত্ফর রহমানের কাছ থেকে ২ টন জিআরের চাল কিনেন। তারা গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর গোডাউন থেকে চালের চালান বের করেন।
এদিকে দৌলতপুর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আহমেদ জানান, গত ৩ মাসের মধ্যে ওই গোডাউন থেকে কোনো জিআরের চালের চালান বের হয়নি, শুধু ওএমএসের চালের চালান বের হয়েছে। আর যে তারিখে ওই সিজ করা চালের চালানের কাগজ দেখানো হয়েছে, সে সময় জিআরের জন্য আতপ চাল বরাদ্দ ছিল, কোনো সিদ্ধ চাল বরাদ্দ ছিল না বলে জানান তিনি।

ছাত্রলীগারদের দৌরাত্ম্যে ৭০ কলেজের উন্নয়নে অনিশ্চয়তা

রিয়াজ চৌধুরী

সারাদেশের ৭০টি সরকারি কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকারের এ মহাপরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে খোদ ছাত্রলীগ ক্যাডারদের কারণে। ৬৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকার এ উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের পর শুরু হয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়া। আর টেন্ডার বাগিয়ে নিতে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি) সূত্রে জানা যায়, টেন্ডার পেতে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা হুমকি-ধামকি দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। টেন্ডার না পেলে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে দেবে না বলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েছে। এ অবস্থায় জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, সারাদেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের কলেজ শিক্ষার বহু বছরের অব্যবস্থাপনা আর সঙ্কট অবসানের জন্য সরকার এ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অথচ সরকারের এ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে মাঠে নেমেছে সরকারদলীয় অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। তারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ৭০টি কলেজের উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসবাবপত্র, পরীক্ষার হল ও আনুষঙ্গিক নির্মাণ কাজে ২১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে, হোস্টেল নির্মাণে ২১৬ কোটি ১২ লাখ, একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ, বিজ্ঞান ভবন নির্মাণে ৩১ কোটি ২২ লাখ, বাণিজ্য ভবনে ১০ কোটি ৬৫ লাখ, কলেজ বাউন্ডারি এবং ভেতরের রাস্তা নির্মাণে ২ কোটি ১০ লাখ, কম্পিউটারের
জন্য ২০ কোটি ৩০ লাখ, অফিস সামগ্রীর জন্য ৩০ কোটি ৫০ লাখ, বিজ্ঞান সামগ্রীর জন্য ৪ কোটি ৯০ লাখ, বইয়ের জন্য ৪ কোটি ৯০ লাখ এবং ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে গ্রন্থাগার।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সব জেলা সদরে অবস্থিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ৭০টি সরকারি কলেজকে। এর মধ্যে ৬৪ জেলায় ৬৪টি কলেজ ছাড়াও ঢাকায় চারটি এবং চট্টগ্রামে আছে অতিরিক্ত দুটি কলেজ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং এই শিক্ষার মানোন্নয়নে এ ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচির দাবি দীর্ঘদিনের। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীসহ সারাদেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই কলেজগুলোতে পড়ালেখা করলেও বছরের পর বছর ভুগছে চরম আবাসন সমস্যায়। আবার এসব কলেজে আছে অনার্স ও মাস্টার্সের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পৃথক পরীক্ষার হল না থাকায় যে কোনো বর্ষের পরীক্ষা, এমনকি উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যে কোনো পরীক্ষার স্থান করে দিতে পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয় কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে নিয়মিত ছুটির বাইরেও এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয় মাসের পর মাস। আবার প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের চরম সঙ্কটও আছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
মাউশি’র মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান উর রশিদ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে আমার দেশকে বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ উচ্চশিক্ষার জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যেসব সঙ্কটের কারণে সারাদেশের এসব কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে তার অবসান হবে। উচ্চশিক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগের প্রভাব সম্পর্কে মাউশি ডিজি বলেন, এ বিষয়টি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি) জানে। তবে যা শোনা যাচ্ছে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। আমরা স্বচ্ছ ও নিয়মের মধ্যেই এ কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করব।
জানা গেছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি টেন্ডার ছাড়া হয়েছে। কলেজের অবকাঠামোসহ সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যে ৭০টি কলেজকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, সরকারি বদরুন্নেসা কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ, নাটোরের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ, ঝিনাইদহের সরকারি কেসি কলেজ, মাগুরার হোসের শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, যশোরের সরকারি এমএম কলেজ. সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, খুলনা সরকারি বিএল কলেজ, বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ, পিরোজপুরের সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ, ভোলা সরকারি কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, রাজবাড়ী সরকারি কলেজ, মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ, মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ, নিলফামারী সরকারি কলেজ, রংপুরের সরকারি কমার্শিয়াল কলেজ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, বগুড়ার সরকারি আযীযুল হক কলেজ, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, নওগাঁ সরকারি কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ, নরসিংদী সরকারি কলেজ, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, টাঙ্গাইলের সরকারি সাদত কলেজ, রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ, বান্দরবান সরকারি কলেজ, শরীয়তপুর সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, লালমনিরহাট সরকারি কলেজ, মেহেরপুর সরকারি কলেজ, ঝালকাঠি সরকারি কলেজ, বরগুনা সরকারি কলেজ এবং পঞ্চগড়ের সরকারি মকবুলার রহমান কলেজ, জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, শেরপুর সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দমোহন কলেজ, নেত্রকোনা সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, মাদারীপুরের নাজিমউদ্দিন কলেজ, সিলেটের এমসি কলেজ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, ফেনী সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ, কক্সবাজার সরকারি কলেজ।

Tuesday, 12 April 2011

গণপূর্ত ভবনে টেন্ডার নিয়ে ছাত্র-যুবলীগের হাতাহাতি

স্টাফ রিপোর্টার

টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে গণপূর্ত ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। টেন্ডারটি ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকার। গতকাল সকালে এই হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে গণপূর্ত ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সিডিউল ড্রপিংয়ের কাজ শেষ করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণপূর্ত বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের টেন্ডার সিডিউল জমা দেয়ার দিন ছিল গতকাল। সকাল ১০টা থেকে সিডিউল জমা দেয়া শুরু হয়। এর মধ্যে মহানগর ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রায় অর্ধশত সদস্য গণপূর্ত ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। তারা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে এ সময় টেন্ডার জমা দিতে আসা ঠিকাদারদের বাধা দিতে থাকে। একপর্যায়ে সকাল ১১টার দিকে গণপূর্ত ভবনের সামনে খোলা জায়গায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে সিডিউল জমার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে র্যাব ও পুলিশের সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গণপূর্ত ভবনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকার করেন।
রমনা থানায় যোগাযোগ করা হলে ডিউটি অফিসার এসআই রোজিনা বেগম বলেন, এ ব্যাপারে থানায় কোনো মামলা হয়নি। কেউ অভিযোগ নিয়েও আসেনি।

Sunday, 27 March 2011

জমি দখলের মহোত্সব











ডেস্ক রিপোর্ট

বিভিন্ন স্থানে জমি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। জমি হারিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দেনদরবার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। বরং ভূমিদস্যুদের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন জমির প্রকৃত মালিকরা। বিস্তারিত খবর পাঠিয়েছেন প্রতিনিধিরা :
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
রূপগঞ্জের ভুলতা ইউনিয়নের কৈরাবো গোরস্থানসংলগ্ন ৩ বিঘা জমি আওয়ামী লীগের শেল্টারে ভূমিদস্যুরা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভূমিদস্যু বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষ। উপজেলার সর্বত্রই জোরপূর্বক জমিদখল অব্যাহত রয়েছে। জমিদখলকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী জানায়, উপজেলার মর্তুজাবাদ গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে শামসুর রহমান, মাহাবুব, মোখলেছুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শেল্টারে একদল সন্ত্রাসী গতকাল সকালে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জোরপূর্বক ৯০ শতাংশ জমি দখল করে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জোরপূূর্বক নিরীহদের জমিদখল অব্যাহত রেখেছে।
এ ব্যাপারে জমির মালিক আড়াইহাজার উপজেলার জালালউদ্দিন, আবুল কাশেম, ইদ্রিস আলী, মর্তুজাবাদ গ্রামের মধু ভূঁইয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে কৈরাবো গোরস্তান এলাকায় ৯০ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসছে। জমির মালিকানা ছেড়ে দেয়ার জন্য ভূমিদস্যু বাহিনী একের পর এক হুমকি দিয়ে আসছিল। গতকাল দলবল নিয়ে জমির বাউন্ডারি দেয়াল ভেঙে তারা দখল করে। ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে শামসুর রহমান ও মাহাবুবের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারি মাসে গোলাকান্দাইল ৫নং ক্যানেল এলাকায় মাধবদী পৌর এলাকার জাকির হোসেনের ১২ শতাংশ জমি একই কায়দায় জোরপূর্বক দখলে নেয়। পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও জাকির হোসেন তা পাননি। এ বাহিনীকে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার বদৌলতে একের পর এক জমি দখল অব্যাহত রেখেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। জমি দখলকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।
ভুলতার গার্মেন্ট এলাকায় এক নিরীহ ব্যক্তিকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দেড় লাখ টাকা চাঁদা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে। জমি দখলকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জে গত ২ বছরে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
কাপ্তাই (রাঙামাটি)
চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান স্টেশনসংলগ্ন নবগ্রাম এলাকায় দুজন অসহায় মহিলার প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ৬ শতক জমি দখল করে নিয়েছে স্থানীয় কিছু ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। আদালতে মামলা বিচারাধীন এবং বিরোধীয় জমিতে স্থিতাবস্থার আদেশ থাকা সত্ত্বেও ভূমিদস্যুদের তাণ্ডবে অসহায় ভূমির মালিক ন্যায় বিচার পেতে প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়ে যাচ্ছেন।
আদালতে দায়েরকৃত মামালার বিবরণ এবং অসহায় মহিলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, লিচুবাগান সংলগ্ন নবগ্রাম এলাকায় শাহনাজ বেগম ও ফরিদা বেগম প্রায় ১৩ বছর আগে ১২ শতক জায়গা কিনে সেখানে বাড়ি ও আধাপাকা দোকানঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিলেন। এছাড়া মহিলার ১২ শতক জায়গায় নির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীরও নির্মিত আছে। এ অবস্থায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে স্থানীয় কিছু ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের সদস্য অসহায় মহিলাদের ১২ শতক জায়গার মধ্যে ৬ শতক জায়গা দখল করে নিতে সীমানা প্রাচীরের ভেতরে ইট-বালু-সিমেন্ট জড়ো করে নতুন সীমানা প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা করে। পরে গত ৪ মার্চ ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট জোরপূর্বক শাহনাজ বেগমের সীমানা প্রাচীরের ভেতর প্রবেশ করে ৬ শতক জায়গার ওপর নতুন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে জোরপূর্বক দখল করে নেয়। তার আবাসস্থল ভূমি রক্ষায় প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেছেন।
আলীকদম (বান্দরবান)
বান্দরবানের আলীকদমে শতাধিক মুরুং গ্রামবাসী ভূমিদস্যুতা ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। স্থানীয় শামসুল আলমের বিরুদ্ধে মুরুংরা বাগানের গাছ কর্তন, চাঁদা আদায় ও মামলায় জড়িয়ে হয়রানির অভিযোগে মুরুংপাড়া কার্বারী পাক্কাই মুরুংসহ শতাধিক গ্রামবাসী এ অভিযোগ করেন।
প্রাপ্ত অভিযোগে প্রকাশ, আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের দুপ্রু ঝিরি এলাকায় ২০টি পরিবারে শতাধিক মুরুং বাস করেন। তাদের ভোগদখলীয় জমিতে কারিতাস ফলদ ও বনজ বাগান সৃষ্টিতে সহযোগিতা করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছপালা বড় হয়েছে। এসব বাগানের গাছের প্রতি লোলুপদৃষ্টি পড়ে রেপারপাড়ি এলাকার মৃত নুর আহামদের ছেলে শামসুল আলমের। অভিযোগে কার্বারী পাক্কাই মুরুং জানান, সন্ত্রাসী কায়দায় শামশুগং কর্তৃক মুরুংদের দখলীয় ও রোপিত বাগানের সেগুন, গামারি ও আমগাছগুলো কেটে নেয়া হচ্ছে। এতে বাধা দেয়ায় এর আগে ১২ নিরীহ মুরুংকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়। মামলার ভয় দেখিয়ে শামসুুল আলম গং মুরুংদের রোপিত ৩৩টি আম, ৩৯টি কাঁঠাল, ৫১টি সেগুন, ১০০টি গামারি গাছ ও ৩ হাজার উরাবাঁশ কেটে নিয়েছে বলে স্থানীয় পুংপ্রে মুরুং জানান।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে দুপ্রু ঝিরি এলাকায় স্থানীয় আবুল হোসেন সর্দার, আরাফাত, নুরুল কবির, সালাহ্উদ্দিন, রুকনউদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, মুরুংরা নানাভাবে শামশুগং কর্তৃক নির্যাতনের শিকার। তারা মুরুংদের রক্ষায় প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রুথোয়াই অং মার্মা জানান, ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে শামসুর বিরুদ্ধে মুরুংদের নানা অভিযোগ রয়েছে। যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত শামসুল আলম মঙ্গলবার মুঠোফোনে জানান, মুরুংদের অভিযোগ সঠিক নয়।
দুপ্রু ঝিরি এলাকায় তার ক্রয় করা জমি থেকেই গাছ কর্তন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন
।

নরসিংদীতে মসজিদ ও মাজার ভেঙে জমি দখল করেছে আ’লীগ নেতা

মো. মাজহারুল পারভেজ মন্টি নরসিংদী
ভূঁইফোড় এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা সড়ক ও জনপথের জমি আর ব্রহ্মপুত্র নদ দখল করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাতের অন্ধকারে মসজিদ আর পুরনো মাজার গুঁড়িয়ে দিয়ে অপরাধের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নরসিংদী সদর উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে ভগিরথপুরে প্রায় পনের কোটি টাকা মূল্যের এই জমি দখলকারী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর নাম আওলাদ হোসেন মঞ্জু।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্ম ও সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মসজিদ ও মাজার ভাঙার এ নায়কের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে স্থানীয় জনগণ। এ অপকর্মে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তার দাঙ্গাবাহিনী প্রধান নাছিরকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু পরে তার অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে।
দিনরাত তার পালিত বাহিনীর সদস্যরা চারদিক ঘিরে রেখেছে গোটা এলাকা। পুলিশও পিছু হটেছে। তবে পুলিশের দাবি, কেউ মামলা না করায় তারা কোনো অ্যাকশনে যেতে পারছে না। এদিকে জনগণ ভয়ে মামলা না করলেও সড়ক ও জনপথ এবং নদী দখলের কারণে স্থানীয় এসি ল্যান্ড অফিস থেকেও কেন মামলা করা হয়নি, এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্ট দুটি দফতর থেকে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাবিবুর রহমান হাবিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে মুখ না খুললেও পরে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ফোনে ডেকে নিয়ে আসেন অভিযুক্ত আওলাদ হোসেনকে। নদী দখল করার কারণে তাকে স্টুপিড বলে গালিও দেন।
পরে এসি ল্যান্ড নদীতে ভরাটকৃত মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেও এক মুঠো মাটিও সরাতে দেখা যায়নি।
এদিকে মসজিদ ও মাজার ভাঙার ব্যাপারে অভিযুক্তের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা তা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক অমৃত বাড়ৈ জানান, ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে টানা-হ্যাচরা করা খুব সেনসেটিভ ব্যাপার। এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা করার জন্য পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক। তবে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করে কেন প্রতিকার পাওয়া গেল না, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি পুলিশকে ঘটনাটি দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আওলাদ হোসেন অন্যায়ভাবে কোনো কিছুই করছেন না দাবি করলেও মসজিদ আর মাজার ভাঙার কথা স্বীকার করেন তিনি। এ এলাকার অনেক মসজিদ-মাদ্রাসা তার টাকায় চলে দম্ভোক্তি করে তিনি আরও বলেন, এই অল্প কিছুদিনের মধ্যে এক কোটি টাকা দান করব কিন্তু লোক পাচ্ছি না। আপনারাই সেই লোক কিনা অন্যের জায়গা দখল করছে।
এদিকে অভিযুক্তের আপন বড় ভাই রতন মিয়া ও স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পপতি সাজন ভূঞা জানান, যে মাজারটি রাতের অন্ধকারে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে তার নাম কালু শাহর মাজার। মুরব্বীদের কাছে শুনেছেন, এ মাজারের বয়স আনুমানিক তিনশত বছর। এ মাজার ভাঙায় তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন এখানকার কয়েক হাজার মানুষ। এ মাজার ভাঙার কারণে যে কোনো সময় আইন শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে বলেও তারা দাবি করেন।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার লোকজন জমায়েত হয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, জন বিস্ফোরণ পুলিশের পক্ষে ম্যানেজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়