Saturday, 1 October 2011

সব টাকা যাচ্ছে সরকারের পেটে : বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণের আকাল

সৈয়দ মিজানুর রহমান
মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক ছিল বেসরকারি খাতে বৃহত্ ঋণের বড় জোগানদাতা। দেশের মুদ্রাবাজারেও অর্থের জোগানদাতা হিসেবে এসব ব্যাংকই বড় ভূমিকা রাখত। তবে দিনবদলের পাল্লায় পড়ে এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এখন খুবই নাজুক।
সরকারি ব্যাংকে গিয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তারা টাকা পাচ্ছেন না। আর সরকারি ব্যাংকের বেহাল দশার মধ্যেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এখন দৈন্য দশায়। সরকারি-বেসরকারি গোটা ব্যাংকিং খাতেই ঋণের আকাল শুরু হয়েছে। শিল্পে তো নয়ই, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের স্বল্পমেয়াদে দৈনন্দিন কাজেও অর্থের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। বছরজুড়েই এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ব্যাংকগুলোর জন্য সামনে আরও বিপদ আসছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সরকার ব্যাংকগুলোর সব টাকাই নিয়ে নিচ্ছে। সরকারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর অবস্থা নাকাল। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়েছে ব্যাংকে নগদ জমার হার শিথিল করতে।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে গড়ে প্রতিদিন ৪৮৬ কোটি, রূপালী ব্যাংক ৪৫৬ কোটি, জনতা ব্যাংক এক হাজার ২৪৬ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা ধার করছে। মূলত সরকারের ঋণের চাহিদা মেটাতে গিয়েই মুদ্রাবাজার থেকে টাকা ধার করতে হচ্ছে এসব ব্যাংককে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে ৬ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে নেয়া হয়েছে ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা।
এর আগে চলতি অর্থবছরের ২১ আগস্ট পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে মোট ঋণ নেয় ৫ হাজার ২২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এ সময়ে আগে নেয়া ঋণের এক টাকাও পরিশোধ করতে পারেনি সরকার। অথচ গত বছরও একই সময়ে পরিশোধ হয়েছিল ৫৫৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা ঋণ।
ব্যাংকিং খাত থেকে বেপরোয়া ঋণ গ্রহণ সরকারের অর্থব্যবস্থা ব্যাংক ঋণনির্ভর হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। পরিচালনা ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংকিং খাতের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতার নজির অতীতে আর নেই বলেও মনে করেন তারা। আর সরকারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে শিল্প বিনিয়োগে বড় আকারের ঋণ দেয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের বাড়তি চাহিদা পূরণে ছাপছে নতুন টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তফসিলি ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ করলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ কমে আসে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ করলে, যদি বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে তফসিলি ব্যাংকের কাছ থেকে তা তুলে নিতে না পারে, তবে শেষ পর্যন্ত নতুন টাকা বাজারে বেড়ে যায়। আর এতে বাড়ে দ্রব্যমূল্য।
এদিকে, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলও (আইএমএফ) সরকারের অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইএমএফের একটি মিশন সরকারকে প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংক নগদ অর্থের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোকে ঋণ দিতে গিয়েই এই চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ১ হাজার ৭৫০ কোটি, ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
এছাড়া দুই মাসে বিভিন্ন মেয়াদি বন্ড প্রাইমারি ডিলারদের মাধ্যমে নিলাম করে সরকার ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরে বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছিল ১৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদায়ন হয়েছে মাত্র ৪৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার বন্ড। জানা গেছে, ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদানও ব্যাংকগুলোর তারল্যে চাপ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক তদবিরের কারণে ব্যাংকগুলোকে তড়িঘড়ি করে বেশকিছু ঋণ দিতে হয়েছে। ফলে সাধারণ উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। সাধারণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ঋণ আবেদন গ্রহণ না করতেও মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট শাখাকে।
জানা গেছে, সরকারের সামগ্রিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৯ হাজার ২৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এক বছরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ২৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ২০ হাজার ৩৯১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ২৭ হাজার ২০৮ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উত্স থেকে ১৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা এবং ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ৮ হাজার ২৫১ কোটি টাকা নেয়া হবে। বর্তমান হারে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিতে থাকলে বছরের অর্ধেক সময়েই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গত প্রায় দেড় বছর ধরেই সরকারি ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের ঋণ দিচ্ছে না। তবে অতিসম্প্রতি ঋণের আবেদন নেয়াও বন্ধ করে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী গতকাল আমার দেশকে জানান, ‘আমরা ব্যাংক ঋণ পাচ্ছি না। ছোট ঋণ প্রাপ্তিতে আগে সমস্যা ছিল না। গত দুই মাস ধরে ঋণের আবেদনও নেয়া হচ্ছে না সরকারি ব্যাংকে। একই অবস্থা বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেও।’ কারণ জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও ইএবি’র সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘শেয়ারবাজারে ধসের পর অনেক ব্যাংক নিজেরাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটের ফলে এতদিন শিল্পে বিনিয়োগ হয়নি, এখন কিছুটা উন্নতির দাবি করা হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে। কিন্তু এখন আবার সরকার ব্যাংকের সব টাকা নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বিনিয়োগে মন্দা স্থায়ী রূপ নিতে পারে।’
এদিকে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক সঙ্কটের কারণে নগদ অর্থের জমার ক্ষেত্রে শর্ত কিছুটা শিথিল করে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সিকিউরিটিজে (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) বিনিয়োগ করতে পারবে সংশ্লিষ্ট মাসে রক্ষিতব্য সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদের (এসএলআর) ৭৫ শতাংশ। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন থেকে জারিকৃত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এ নির্দেশনা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সাময়িকভাবে ব্যাংকের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট মাসের এসএলআরের ৫০ শতাংশের স্থলে ৭৫ শতাংশ পুনর্নির্ধারণ করা হলো। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর নগদ টাকা জমা রাখার প্রবণতা কমে যাবে। ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
সরকার বেপরোয়া ঋণ নিলেও এই ঋণের টাকা কোথায় যাচ্ছে তার কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বেহাল দশা চলছে। ফলে ঋণের টাকায় যে উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে তা মানতে নারাজ অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজ বলেন, সরকারের ঋণের টাকার হিসাব দেয়া দরকার। এভাবে খরচ করতে থাকলে একসময় ব্যাংকিং খাত যেমন সমস্যায় পড়বে, তেমনি গোটা অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

Saturday, 24 September 2011

সাড়ে ৩ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ করে নিয়েছেন যুবলীগ নেতারা

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিআরই) শাখার রাস্তা মেরামত ও সংস্কার কাজের ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার টেন্ডার নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছে স্থানীয় যুবলীগ নেতারা। টেন্ডার দাখিলের আগেই সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা গোপনে বৈঠক করে এ কাজ হাতিয়ে নেয়। সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধের বিএল স্কুল থেকে রানীগ্রাম গ্রোয়েন পর্যন্ত নিচের অংশের রাস্তা মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য দরপত্র (কাজের নাম-আরএসএইচপি, প্যাকেজ নং-১) আহ্বান করে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বুধবার দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন এবং ওই দিন বিকাল ৩টায় দরপত্র বাক্স খোলা হলেও এর আগে স্থানীয় যুবলীগের একটি গ্রুপ সিন্ডিকেট করে এসব সিডিউল হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করে। তারা বৈঠক করে যুবলীগ নেতাদের কাজ দেয়ার বিষয়টি ঠিকাদারদের জানিয়ে দেয়। এ বৈঠক আহ্বানকারী যুবলীগ নেতাদের ওই গ্রুপ। যে কারণে শুধু সিরাজগঞ্জে ৩৮ এবং বগুড়ায় ৩টি সিডিউলসহ ৪১টি বিক্রি হলেও দাখিল হয়েছে মাত্র ৬টি। বৈঠকে সমঝোতা অনুযায়ী পিয়াস কনস্ট্রাকশনকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। টেন্ডার কমিটির চেয়ারম্যান এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান। সিরাজগঞ্জ জনতা ব্যাংক মাছুমপুর শাখা ও বগুড়া জনতা ব্যাংকে এসব সিডিউল বিক্রি করা হয়। সিরাজগঞ্জ জনতা ব্যাংক মাছুমপুর শাখার
সহকারী ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন জানান, গত ২১ আগস্ট টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশের পর গত ১৩, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর আমাদের কাছে ৩৮টি সিডিউল বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। সবগুলো সিডিউল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। বুধবার দরপত্র দাখিলের জন্য সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিআরই) শাখায় টেন্ডার বাক্স দেয়া হয়। পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান সোহেল ১টি এবং বিআরই শাখায় ৬টি দরপত্র দাখিল করা হয়। সমঝোতার কারণে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তার দাখিল করা দরপত্র প্রত্যাহার করে নেয় বলে ঠিকাদার সূত্রে জানা গেছে। বুধবার সকাল থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় অবস্থান নেয়। তারা অফিসের ভেতরে না গেলেও বাইরে অবস্থান করতে থাকে। ঠিকাদারদের দরপত্র দাখিল না করার জন্য অনুরোধ করা হয় এবং বিক্রি হওয়া ৪১টি সিডিউল রাতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। এ কাজের একটি অংশ সিডিউল ক্রয়কারী ঠিকাদারদের মধ্যে বিতরণ করার কথা রয়েছে। গত ৯ দিনের ব্যবধানে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি টেন্ডার হাতিয়ে নিল যুবলীগ নেতারা। তবে এ যুবলীগ নেতাদের নিজস্ব কোনো ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই। অন্য ঠিকাদারের লাইসেন্সে তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ শক্তিশালী প্রকল্পের ৫ কোটি টাকার টেন্ডার সমঝোতা হয়। সেই টেন্ডারে মাত্র ৩টি সিডিউল দাখিল করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট গত ১৩ সেপ্টেম্বর আমার দেশ-এ প্রকাশিত হওয়ার পর জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যে কারণে এবার লোক দেখানোর জন্য ৬টি সিডিউল দাখিল করা হয়। এটি সমঝোতার বৈঠকে সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরই শাখার) উচ্চমান সহকারী আবদুস সাত্তার জানান, সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধের নিচের অংশের সড়কে সরকারি বিএল স্কুল থেকে রানীগ্রাম গ্রোয়েন পর্যন্ত এ সড়কে সংস্কার কাজের জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজে সমঝোতা হয়েছে তা আমরা জানি না। এ ব্যাপারে কোনো ঠিকাদার আমাদের কাছে অভিযোগও করেনি।
টেন্ডার কমিটির চেয়ারম্যান ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিআরই) শাখার এসডি আনোয়ার সাদাদ বলেন, টেন্ডার বাক্স থেকে দরপত্র খোলা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কাজের বিষয়টি ঠিক হয়নি। কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে জানতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে। কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

Wednesday, 21 September 2011

রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ১০ ব্যাংক : ক্ষমতাসীনদের ভাগবাটোয়ারা



সৈয়দ মিজানুর রহমান
ব্যাংকিং খাতে চলমান তীব্র তারল্য সঙ্কট, দেশের নাজুক অর্থনীতি এবং বর্তমানে ১৭টি ব্যাংক ঝুঁকিতে থাকার পরও মহাজোট সরকার নতুন করে আরও অন্তত ১০টি ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে যাচ্ছে। লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে শুরুতেই বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের অনেকেই পাচ্ছেন নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন। আবার লাইসেন্স পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে চলছে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যও।
এদিকে নতুন ব্যাংকের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানান, বাস্তবেই আমাদের অর্থনীতি এতো বড় না, তাই বেশিসংখ্যক ব্যাংক দেয়ার সুযোগও এখন নেই। এ দিকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোরভাবে দেখছে। তবে সরকার যতগুলো ব্যাংক চাচ্ছে আমাদের সেই চাহিদা পূরণের সুযোগ নেই। নতুন ব্যাংক বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি সরকারের একটি রাজনৈতিক ইচ্ছা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আরও নতুন ১০টি ব্যাংকের অনুমোদন দিতে বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ৪টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে বাকি ৬টির বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনার কথা বলা হয়েছে পর্ষদ বৈঠকে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পর্ষদ বৈঠকে বলা হয়, নতুন ব্যাংক পেতে ৮২টি আবেদন জমা আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বর্তমান সরকারের আমলে ২০টি আবেদন জমা পড়েছে। মূলত বর্তমান সরকারের আমলে করা আবেদনের মধ্য থেকেই বাছাই হবে, কারা পাবেন নতুন ব্যাংক। তবে এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় তালিকা পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তাদের পছন্দের নতুন ব্যাংকগুলোর নাম। আর এর মধ্যে আছে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়স্বজন।
এদিকে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের গাইডলাইন বদলে ফেলা হচ্ছে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শর্ত শিথিল করতেই এই খসড়া বদলে ফেলা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আগের গাইডলাইনে এমন শর্ত ছিল যে, ‘ঋণখেলাপি এবং করখেলাপি এমনকি গত ৫ বছরের মধ্যে খেলাপি ছিলেন এমন কেউ নতুন ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবেন না’।
জানা গেছে, নতুন ব্যাংক স্থাপনের বিষয়ে তোড়জোড় শুরু হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তালিকা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকা অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে নতুন ব্যাংকের জন্য আবেদন করা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস ও শেখ সালাহ উদ্দিন। তাদের ব্যাংকের নাম দেয়া হয়েছে মধুমতি ব্যাংক। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং সরকারি হিসাব সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর একাই চেয়েছেন দু’টি ব্যাংক। এর একটির নাম দেয়া হয়েছে ফারমার্স ব্যাংক ও অন্যটির নাম এসএমই ব্যাংক। দি ফারমার্স ব্যাংক গুলশানে অফিস খুলে এরই মধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল ‘রূপায়ণ ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংকের আবেদন করেছেন।
শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের নামেও কয়েকটি ব্যাংকের আবেদন করা হয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নামে সেলফ এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক নামে একটি ব্যাংকের আবেদন এসেছে। ড. এসএম শওকত আলী ‘ক্যাপিটাল ব্যাংক’, এনজিও ব্যক্তিত্ব অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম ‘টিএমএসএস ক্ষুদ্র পুঁজি ব্যাংক’, ড. মো. শামসুল হক ভূঁইয়া ‘অ্যাপোলো ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক চেয়েছেন। প্রবাসী কমার্শিয়াল ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক চেয়েছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা ফরাসত আলী। তার সঙ্গে আছেন ব্যবসায়ী নেতা কুতুবউদ্দিন। দি ব্যাংক অব এনআরবি’র আবেদন করেছেন মোল্লা ফজলুর রহমান, নিজাম চৌধুরী ও আরিফুর রহমান। আরবান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আবেদনে নাম আছে সাজ্জাদুল ইসলাম, মো. হেলাল মিয়া ও বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহসীন উদ্দিনের। ডাইনামিক ইসলামী ব্যাংকের আবেদনকারীরা হলেন বারেকুর রহমান, মো. হেলাল মিয়া ও তাজুল ইসলাম। রয়েল ব্যাংকের প্রস্তাবক হচ্ছেন নুরুল কাইয়ুম খান, জাহাঙ্গীর আলম খান ও আজিজুল খান চৌধুরী। কে টি আহমেদ আবেদন করেছেন বন্ড অ্যান্ড মর্টগেজ ব্যাংক (বিএমবি) প্রতিষ্ঠার। এক্সপ্রেস নামে ব্যাংক পেতে আবেদন করেছেন নাসিম আহমেদ, শাহরিয়ার আলম ও এবাদুল করিম।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিদেশি ব্যাংক আছে ১৮টি। এর বাইরে বেসরকারি ব্যাংক ৩০টি। মোট ৪৮টি ব্যাংক রয়েছে দেশে। এর বাইরে ৬০টি বীমা কোম্পানি আছে। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে এরশাদের আমলে (১৯৮২-১৯৯০) অনুমোদন দেয়া হয় ৯টি ব্যাংকের। বিএনপি আমলে (১৯৯১-১৯৯৬) ৮টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের আমলে (১৯৯৬-২০০১) দেয়া হয় ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদন। তবে (২০০১-২০০৬) পর্যন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে বিএনপির আমলে এবং সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশে আর কোনো ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়নি।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি অথবা তার পরিবারের কোনো সদস্য কোনো ব্যাংক অথবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হলে এবং সরকারের কাছে করখেলাপি হলে তিনি প্রস্তাবিত ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবেন না। এমনকি কেউ গত ৫ বছরের মধ্যে ঋণ বা করখেলাপি থাকলে এবং এ বিষয়ক কোনো মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তিনি নতুন ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবেন না। নতুন ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা এবং শুধু সাধারণ শেয়ারের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন গঠিত হবে। ব্যবসা শুরুর তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে বাজারে শেয়ার ছেড়ে পরিশোধিত মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। ৫ শতাংশ অথবা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ শেয়ারধারী উদ্যোক্তার মূলধন সংরক্ষণ চুক্তি সই করতে হবে এবং চুক্তির মাধ্যমে তারা অঙ্গীকার করবেন, ভবিষ্যতে নতুন ব্যাংকটি যদি কখনও মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয় তাহলে উদ্যোক্তারা ঘাটতি মূলধন সরবরাহ করবেন। একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন এক কোটি টাকার শেয়ার এবং সর্বোচ্চ মোট মূলধনের ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা কোনো পরিবারের সদস্যরা একক, যৌথ বা উভয়ভাবে প্রস্তাবিত ব্যাংকের মোট মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না। উদ্যোক্তাদের তাদের আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত নিট সম্পদ থেকে প্রস্তাবিত ব্যাংকের মূলধন সরবরাহ করতে হবে। তবে এসব শর্ত থাকলে ক্ষমতাসীনদের অনেকেই ব্যাংক পাবেন না। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে তাদের নতুন ব্যাংকের গাইডলাইন বা খসড়া পরিবর্তনের।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার কার্যক্রম শুরুর তাগিদ আসে গত জুনে। এর পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি জরিপ কার্যক্রম শুরু করে, যা পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীতা বিষয়ে এই প্রতিবেদনে সরাসরি নতুন ব্যাংকের বিরোধিতা করা না হলেও, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বুঝানো হয়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে নতুন আর কোনো ব্যাংকের দরকার নেই। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের অর্থনীতির আকার বাংলাদেশের মতো। শ্রীলঙ্কায় ব্যাংকের সংখ্যা ৩৭টি এবং পাকিস্তানে ৪৫টি। বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৪৮টি। তুলনামূলকভাবে বড় অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় ব্যাংকের সংখ্যা ৩১টি এবং ভারতে ১৬৩টি। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আমাদের দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংক বেশি। এর আগে ২০০৫ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ২৭২তম সভায় বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংক স্থাপন সংক্রান্ত একটি নীতিমালা উপস্থাপন করা হলে পর্ষদ তা অনুমোদন করে। তবে তার অর্থ এই ছিল না যে, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। বরং দেশের অর্থনীতি ও অর্থবাজারের আকার, সঞ্চয় সৃষ্টি ও মূলধন গঠনের হার, আর্থিক খাতের গভীরতা, বিদ্যমান ব্যাংকিং অবকাঠামো ও ব্যাংকিং সেবার চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনায় নতুন কোনো ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত হবে না মর্মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ ওই সময় মতামত দেয়।
এদিকে আইএমএফ’র তরফ থেকেও বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে সাফ জানিয়ে দেয়। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রধান ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন ব্যাংকের বিরোধিতা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত অনুমোদন না দিলেও এর আগেই নতুন ব্যাংকের নামে অনেকেই অফিস চালু করেছেন বলে জানা গেছে। গুলশান-১-এর জব্বার টাওয়ারে খোলা হয়েছে প্রস্তাবিত ফারমার্স ব্যাংকের অফিস। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ফারমার্স ব্যাংকের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এভাবে কার্যালয় খুলে কার্যক্রম চালানো নজিরবিহীন।
নতুন ব্যাংক বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টি সরকারের একটি রাজনৈতিক ইচ্ছা। তিনি বলেন, সরকার বেসরকারি খাতে আরও কিছু নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার পক্ষে। তবে ঠিক কয়টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার নতুন ব্যাংক স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর আগে অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইআরএফ আয়োজিত এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি সরকারের একটি রাজনৈতিক ইচ্ছা। দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেয়ার জন্যই নতুন ব্যাংক কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। অন্যদিকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানিয়েছেন, ‘আমরা যখন দেখলাম সরকার নতুন ব্যাংক করবেই তখন একটি সমীক্ষাকে সামনে রেখে নতুন কিছু শর্ত দিয়ে একটি খসড়া বা গাইডলাইন তৈরি করেছি। এতে কঠিন অনেক শর্তই আছে। প্রকৃত উদ্যোক্তা ছাড়া অন্যরা হয়তো নতুন ব্যাংক পাবেন না। তবে নতুন ব্যাংক সংখ্যায় খুবই সীমিত হবে। হয়ত ২/৪টি অনুমোদনের বিষয় ভাবছে বোর্ড।’ আপনার ওপর রাজনৈতিক চাপ আছে কিনা? থাকলে কারা দিচ্ছে? জানতে চাইলে ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘ব্যক্তি হিসেবে আমি হয়ত কোনো মতের বা আদর্শের হতে পারি, তবে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারে বসি তখন আমার কাছে সেটি ক্ষীণ। আমি বিশ্বাস করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেয়া যায় না। তবে সরকার চাইছে কিছু ব্যাংকের অনুমোদন আমরা দেই।’ কাউকে সুযোগ দিতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের শর্ত শিথিল করবেন কিনা—প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। শর্ত মেনে কউ পারলে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করবে।

Tuesday, 16 August 2011

নোয়াখালীতে সরকারি দলের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জমি দখলের হিড়িক



















ইয়াকুব নবী ইমন, সোনাইমুড়ী (নোয়াখালী)
নোয়াখালীতে ক্ষমতাসীন দলের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সরকারি জাগয়া দখলের হিড়িক পড়েছে। প্রকাশ্যে সরকারি কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল হলেও স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে একেবারে নীরব। প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। ফলে সরকারি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দখলদারদের সঙ্গে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। আর সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।জানা গেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলের নাম ভাঙিয়ে একটি দখলদার চক্র নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় দলীয় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সরকারি জায়গা দখল করছে। তারা আ’লীগ, শ্রকিম লীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদসহ দলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন ভূইফোঁড় সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে সরকারি জায়গা দখল করছে। তাদের দখল তালিকায় রয়েছে সরকারি খাস জমি, সড়ক ও জনপথ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদের ও সম্পত্তি। এসব সরকারি জায়গায় প্রথমে খুঁটি দিয়ে দলের বা সংগঠনের জেলা, উপজেলা, শহর নগর ও কলেজ শাখার অফিসের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়। পরে তা দখল করে ঘর নির্মাণ করে অন্যের কাছে পজিশন বিক্রি করা হয়।দলীয় সাইনবোর্ড ব্যবহার করে সরকারি জায়গা সবচেয়ে বেশি দখল হচ্ছে জেলার সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ ও সেনবাগে। এরপরই রয়েছে নোয়াখালী সদর, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, চাটখিল ও কবিরহাট উপজেলা।সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল লতিফ দলীয় সাইনবোর্ড ব্যবহার করে জয়াগ বাজারে সরকারি জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করে। বিষয়টি এলাকাবাসী সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসিনা বেগম ও এসিল্যান্ডকে জানালেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেননি। চৌমুহনীর চৌরাস্তায় বেগমগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মামুনুর রশিদ কিরণের নাম ভাঙিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কয়েক কোটি টাকার জায়গা দখল করে রাতারাতি মার্কেট নির্মাণ করছে দখলদার চক্র। বেগমগঞ্জ থানার মাত্র কয়েকশ গজ দূরে প্রকাশ্যে সরকারি জায়গা দখলের ঘটনা ঘটলেও দখল ঠেকানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এক সময়ের জেএসডি নেতা আবুল খায়ের চৌমুহনীর দক্ষিণ বাজারে সরকারি খাল দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানালেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বেগমগঞ্জের কাজিরহাটে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েক নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধু পরিষদ কাজিরহাট আঞ্চলিক অফিস সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ব্যবসায়ী মফিজের বন্দোবস্তের জায়গাটি দখল করে নিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। চৌমুহনী রেলওয়ে কোয়ার্টারসংলগ্ন সরকারি জলাশয়ের পাড়ে বেগমগঞ্জ থানা শ্রমিক লীগ প্রধান কার্যালয় ও বেগমগঞ্জ থানা, চৌমুহনী পৌর এবং কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেনবাগের শ্রমিরমুন্সি বাজারে জেলা আ’লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মানিক দলীয় সাইনবোর্ডে সংখ্যালঘুদের জায়গা দখল করে নেয়। এ সময় সেনবাগ থানা পুলিশ টহলে থাকলেও তারা সংখ্যালঘুদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এর আগে বেগমগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ কিরণ দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জেলা জাপা সভাপতি সালাহ উদ্দিন আহম্মদের চৌমুহনী-মাইজদী সড়কের পাশের বিপুল পরিমাণ জায়গা দখল করে নেয়। এ নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা চলছে। নোয়াখালীতে একের পর সরকারি খাল, ডোবা, নালা দখল হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে জেলাব্যাপী দেখা দেয় কৃত্রিম বন্যা। নোয়াখালী সওজ’র প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী শ্যামল বাবু জানান, অভিযোগ পেলে আমরা অবিশ্যই ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া তাত্ক্ষণিক দখল ঠেকাতে আমাদের যে লোকবল দরকার, তা নেই। নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী হাবিবুর রহমান জানান, খাল আমাদের হলেও খালের পাশের জায়গা জেলা পরিষদের। কেউ পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি।এ ব্যাপারে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি সরকারি সম্পত্তি দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সহসা দখল উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেয়া হবে

Wednesday, 10 August 2011

সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়েছেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা  জমি কেরুর, লাভের টাকা দলীয় লোকদের পকেটে


















ছবি: প্রথম আলো
কামরুল হাসান ও শাহ আলম | তারিখ: ১১-০৮-২০১১ | ২১৬

দলীয় পরিচয়ের সুবাদে চাকরি হয় কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে। চাকরিতে ঢুকেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রথম বছর বেনামে ৩৬০ বিঘা জমি ইজারা নেন। এবার নিয়েছেন আরও ১৪১ বিঘা। তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক আবদুল কুদ্দুস। এখন হিজলগাড়ি বাণিজ্যিক খামারের কেরানি। তবে নামমাত্র দরে ইজারা নেওয়া এসব জমি তিনি নিজে আবাদ করেন না। সবই ভাড়া দেন প্রান্তিক চাষিদের কাছে। গত ৩০ জুলাই দুপুরে হিজলগাড়ি খামারে কুদ্দুস নিজের মুখেই বললেন এসব কথা। শুধু কুদ্দুসই নন, তাঁর মতো কেরু অ্যান্ড কোম্পানির অনেক কর্মী এই প্রতিষ্ঠানের জমি ইজারা নিয়ে জমজমাট ব্যবসা ফেঁদেছেন। তবে এসবের কলকাঠি রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। নামে-বেনামে এই নেতা ও কর্মচারীরা নামমাত্র দরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে তা ভাড়া দিচ্ছেন সাধারণ চাষিদের কাছে। এভাবে তাঁরা কামিয়ে নিচ্ছেন বছরে আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু ইজারা নেওয়া জমি ভাড়া দেওয়া বা কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। এদিকে বছরের পর বছর কাঁচামালের অভাবে লোকসান গুনছে এ প্রতিষ্ঠানটি। এই অবৈধ ব্যবসার কথা স্বীকার করেছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম আবদার হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কেরু হলো দুর্নীতির আর্কাইভ, অনিয়মের কোনো শেষ নেই। অবশ্য এখন অনিয়ম কিছুটা দূর হয়েছে। কিন্তু এক দিনে সব দূর করা যাবে না।’ কেরু ও এর সম্পদ: চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রতিষ্ঠান। চিনি কারখানা, ডিস্টিলারি কারখানা ও ওষুধ কারখানা—এ তিনটি বিভাগ নিয়ে ১৯৩৮ সালে এ কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয়। তিনটি শাখার মধ্যে ওষুধ কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন ভিনেগার ছাড়া আর কিছু নেই। চিনিকলটি অলাভজনক হয়ে আছে অনেক বছর ধরে। কারখানার খামার বিভাগ সূত্র জানায়, এ প্রতিষ্ঠানের মোট জমির পরিমাণ নয় হাজার ১৬৮ বিঘা (তিন হাজার ৫৫ দশমিক ৮৪ একর)। এর মধ্যে চাষযোগ্য জমি সাত হাজার ৯২ বিঘা। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় অর্ধেক জমি ইজারা এবং অর্ধেক কোম্পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাষ করা হয়। গত বছর ইজারা দেওয়া হয় তিন হাজার ৪৯২ বিঘা। আর এ বছর ইজারা দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৬০০ বিঘা। আগামী বছরের জন্য নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ইজারা হয় যে কারণে: বেশি দিন এক জমিতে আখ ভালো হয় না। তাই জমির ভারসাম্য রক্ষায় অন্য ফসল করতে হয়। এ কারণে এসব জমি স্থানীয় চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারার মধ্যে যাঁরা ১৮ মাসের জন্য ইজারা নেন, তাঁদের জন্য আখ চাষ বাধ্যতামূলক। আর যাঁরা চার, পাঁচ ও ছয় মাসের জন্য নেন, তাঁরা অন্য ফসল করতে পারেন। শর্তানুসারে মিলের জমিত্রেতামাক, পেঁপে, ভুট্টা ও কলা চাষ করা যায় না। অনিয়ম নেই!: কেরু কোম্পানির জমি ইজারা দেওয়ার আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তা ছাপাও হয় স্থানীয় পত্রিকায়। সাধারণ বিবেচনায় কোনো অনিয়মই নেই। তবে এ দরপত্রের ব্যাপারে সাধারণ কৃষকেরা কোনো তথ্যই পান না। অভিযোগ আছে, গোপনে এসব ইজারা হয়ে থাকে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ গোপন বিজ্ঞপ্তির কথা অস্বীকার করেছে। অস্বীকার করলেও বাস্তবতা হলো, কয়েকজন ক্ষমতাশালী বছরের পর বছর কেরুর কয়েক হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়ে ভোগ করছেন। বিগত চারদলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভোগ করতেন মূলত কেরু কোম্পানির সিবিএ নেতারা। বর্তমান সরকারের আমলে সিবিএ নেতাদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। একজন আল মামুন: সদর উপজেলার ছোট শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা ও কেরুর ইক্ষু উন্নয়ন সহকারী (সিডিএ) আবদুল্লাহ আল মামুন এখন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত বছর তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান এম এ এ এম ট্রেডার্সের নামে নিয়েছেন ৩৪২ বিঘা। এ জমির পুরোটাই তিনি আবার ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর অবৈধ দখল থেকে ১০০ বিঘা জমি উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ দখলের বিষয়টি চিনি খাদ্য শিল্প সংস্থার তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নজরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরুর কর্মচারী মামুন ২০০৭ সালে সারাবেলা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রথমে তিন বছর মেয়াদে ২৮৫ বিঘা চাষযোগ্য ও ২১০ বিঘা বাগান করার যোগ্য জমি ইজারা নেন। এ জমি তিনি ভাড়া দেন। আর ইজারার বাইরে অনেক জমি দখল করেন। ২০০৮ সালে তিনি মিম এন্টারপ্রাইজের নামে ২১০ বিঘা জমি ইজারা নেন। এ প্রতিষ্ঠানটি তাঁর শ্যালক শামীম আহমেদের নামে। ওই সময় তিনি ৩৩ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল করেন। এ ছাড়া সরকারি জমিতে ভুট্টার চাষ নিষিদ্ধ করা হলেও তিনি পুরো জমি ভুট্টার আবাদের জন্য বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেন। কেরুর উপমহাব্যবস্থাপক (খামার) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চপর্যায়ের একটি দল তদন্ত করে মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মামুন প্রথম আলোকে বলেন, জমি নেওয়ার সময় তিনি কেরুর কর্মচারী ছিলেন না। কর্মচারী হওয়ার পর আর জমি নেননি। জমি অবৈধ দখলে রাখার কথা অস্বীকার করে বলেন, মাপজোকে ভুল হওয়ার কারণে তাঁর শ্যালকের নামে কিছু জমি বেশি ছিল। সে জন্য তিনি বাড়তি টাকাও দিয়েছেন। মূল নিয়ন্ত্রণ কারা করেন: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরুর জমি ইজারা নিয়ন্ত্রণ করেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সাংসদ আলি আজগার টগর ও তাঁর লোকজন। সাংসদের অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত গোলাম ফারুক আরিফ এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর সঙ্গে আছেন সাংসদের নিকটাত্মীয় ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমানসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী। তবে সদর আসনের সাংসদ ছোলাইমান হক জোয়ার্দার সেলুনের লোকজনও এটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই দরপত্র জমা দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য দর্শনা, দামুড়হুদা ও চুয়াডাঙ্গায় পৃথক বাক্স রাখা হলেও সেখানে কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেন না। দুই সাংসদের লোকজন এসব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পরে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দরপত্র জমা করা হয়। কিন্তু অনেকেই আর দরপত্র জমা দিতে পারেনি। সাংসদের ঘনিষ্ঠ গোলাম ফারুক আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন না। তবে সাংসদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে। এ ব্যাপারে সাংসদ আলী আজগারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি চীন সফরে আছেন। ইজারা পেয়েছেন যাঁরা খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ইজারা হয়েছে তিন হাজার ৬০০ বিঘা জমি। প্রভাবশালী ৩৮ জন এ জমি ইজারা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাংসদ আলী আজগারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ী গোলাম ফারুক আরিফ একাই নিয়েছেন তিনটি খামারে ৩১৮ বিঘা। বিঘাপ্রতি তিন হাজার ৩৪৬ টাকা ৫৬ পয়সা দরে তিনি এ জমি ইজারা নেন। এম এম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয় ১১৫ বিঘা। বিঘাপ্রতি দর মাত্র দুই হাজার ৫০৫ টাকা। জনৈক আবদুর রাজ্জাক নিয়েছেন ৪৬ বিঘা। খালিদ হোসেন নিয়েছেন ১৯ বিঘা। চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান কবির ঘোলদাড়ি বাণিজ্যিক খামারে ৮১ বিঘা জমি এক ফসলের জন্য ইজারা নেন এক হাজার ৬৮৬ টাকা ৮১ পয়সা দরে। যুবলীগের নেতার নামে ওই জমি বরাদ্দ যথাযথ নিয়ম মেনে না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন একই খামারের অন্য একজন ইজারাদার। বেগমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত ডিহি গ্রামের আবদুল মান্নান ৩২৭ বিঘা জমি ইজারা নেন। ইজারার জমি তিনি ভাড়া দিয়েছেন বছরে নয় হাজার টাকা বিঘায়। কেরু কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক ট্রাক্টরের হেলপার ও বড় শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম নিজের নামে নিয়েছেন ২৯১ বিঘা। তাঁর ছেলে আবদুল হালিমের নামে নিয়েছেন ১৮ বিঘা। বোয়ালিয়া ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রের পাহারাদার নেহালপুরের বাসিন্দা মুবারক হোসেন নিয়েছেন ১৯৮ বিঘা। হোগলডাঙ্গার যুবলীগ নেতা শাহীন নিয়েছেন ৯০ বিঘা, তিতুদহের যুবলীগ নেতা আজিজুল হক নিয়েছেন ৬০ বিঘা, সাবেক সিবিএ নেতা ওয়াহিদুর রহমানের ছেলে আলমগীর নিয়েছেন ৫১ বিঘা। আকন্দবাড়ি খামারের কেরানি দর্শনার বাসিন্দা বাবলুর রশিদ ইজারা নিয়েছেন ১১৭ বিঘা। আলমডাঙ্গার আওয়ামী লীগ নেতা বেলু চৌধুরী নিয়েছেন ১৮৯ বিঘা। প্রথম আলোকে তিনি জানান, এ জমি তিনি চাষিদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। কিছু জমি তাঁর ভাইয়েরা আবাদও করেছেন।

Friday, 5 August 2011

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া : ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা : গণধোলাই

রিয়াজ চৌধুরী
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী ঘুষের ৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে রক্ষা পেলেও সংস্থার সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) বিজয় কুমার ঘোষ গণধোলাই থেকে রেহাই পাননি। বেদম মার খেয়ে সোজা হয়ে হাঁটাই এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে না পেরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই তিনিই সুখবোধ করছেন বলে জানা গেছে।
ইইডি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১টায় নিজ দফতরে ঘুষ নিতে গিয়ে সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে ধরা পড়েন বিজয় কুমার ঘোষ। এসময় গণধোলাইয়ের শিকার হন তিনি। পরে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেন। জানা যায়, সম্প্রতি ৩৬ সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তাদের আবার ঢাকায় আনতে জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা (অগ্রিম ১৫ হাজার ছাড়াও কাজ শেষে ১৫ হাজার) ঘুষ দাবি করেন বিজয় কুমার ঘোষ। এদের একজনের কাছ থেকে অগ্রিম ১৫ হাজার টাকা নিতে গিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। এর পরই শুরু হয় গণধোলাই। ধোলাই থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে কোনো ফায়দা হয়নি।
এর আগে গত জুন মাসে সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিম এক ব্যক্তির কাছ থেকে নেয়া ঘুষ ৫ লাখ টাকা ফেরত দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মিজানুল করিম এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেন। পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে তিনি এ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু লোকটি কাজ না পাওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নালিশ করেন। পরে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে ওই ব্যক্তিকে ঘুষের ৫ লাখ টাকা ফেরত দেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইইডি’র এ দুই কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, টেন্ডারবাজদের সঙ্গে সখ্য এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা বহাল তবিয়বে রয়েছেন। শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালী দুই সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ায় সংস্থায় তাদের দাপটের অন্ত নেই। তারা ইইডিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। যারা বেশি দুর্নীতি করতে পারে তাদেরই যোগ্য বলে ধরা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সংস্থার প্রধান প্রকৌশলীর পদটি আগামী ২২ আগস্ট শূন্য হচ্ছে। সংস্থার বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিমের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তৃতীয় বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। এরই মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিতর্কিত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল হুদা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মিজানুল করিমকে তৃতীয় বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে অনুরোধ জানিয়েছেন। জানা যায়, মিজানুল করিম ২০০৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। পরে প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট তিনি প্রধান প্রকৌশলীর পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শেষ হলে কিছুদিন ওই পদ শূন্য থাকে। কিন্তু তিনি ওই পদে কাউকে বসতে দেননি। পরে প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে ২২ আগস্ট আরও একজন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আনেন।
সংস্থার সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) বিজয় কুমার ঘোষের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণধোলাইয়ের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, দু’মাস আগে ৩৬ জনকে বদলি করা হয়েছে। তারা বৃহস্পতিবার আমার কাছে এসে দাবি করে, তাদের ঢাকায় আনতে হবে। আমি তাদের বলেছি, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, আমি কারও কাছ থেকে ঘুষ নেইনি। এটা আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র।
সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, বৃহস্পতিবার আমি অফিসে ছিলাম না। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে মিটিং ছিল। সেখানে গিয়েছিলাম। বিজয় কুমারের বিষয়টি নিয়ে আমি এখনও ক্লিয়ার নই। তাছাড়া শুক্রবার ও শনিবার অফিস বন্ধ। রোববারে অফিসে গেলে বিষয়টি ক্লিয়ার হওয়া যাবে।

Wednesday, 20 July 2011

সরকারি প্রকল্পের টাকা যাচ্ছে আ’লীগ নেতাকর্মীদের পকেটে













ডেস্ক রিপোর্ট
বিভিন্ন স্থানে সরকারি প্রকল্পের টাকা, গম ও চাল নিয়ে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। কাগজে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি এসব প্রকল্পের টাকা যাচ্ছে আ’লীগের নেতাকর্মীদের পকেটে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, টিআর প্রকল্প ও কাবিখা প্রকল্পসহ সরকারি সব ধরনের প্রকল্পেই এই দুর্নীতি ও লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিস্তারিত খবর পাঠিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।
বাগেরহাট : বাগেরহাট সদর উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ করা গাভী ক্রয়ের টাকার অর্ধেক দামে ক্রয় করা হয়েছে। বাকি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। গত শনিবার এ প্রকল্পের সাড়ে তিন শতাধিক সুফলভোগীর মধ্যে গাভী, টিন, গাছের চারা ও বীজ বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ উপকরণ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর শওকাত আলী বাদশা। জেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা শান্তিরাম দত্ত জানান, গত ৩০ জুন সদর উপজেলার ৭০ জন সুফলভোগীকে ১৯ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয় গাভী ক্রয়ের জন্য। এর আগে আরও ৩০ জনকে একই পরিমাণ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১২০ জনকে বীজ, ৯০ জনকে ২১টি করে গাছের চারা, ১৩০ জনকে হাঁস, ১৪ জনকে টিনসহ মোট ৩৮৪ জনকে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়, যা দিয়ে সুফলভোগীরা ক্রমেই স্বাবলম্বী হবেন।
সরেজমিন শনিবার গাভী ও টিন হস্তান্তর অনুষ্ঠানের সময় টাকাপ্রাপ্তরা যে গাভী এনেছেন তা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে ক্রয় করা গাভী। বরাদ্দকৃত বাকি টাকার কোনো হদিস নেই। এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় সুফলভোগী প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার টাকা। এ থেকে ভ্যাট বাদ দিয়ে প্রত্যেককে ১৯ হাজার টাকা করে দিয়ে তাদের গরু কেনার জন্য বলা হয়েছিল। সুফলভোগীরা নিজেদের পছন্দমত গাভী কিনেছেন। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ হয়তো কিছু কম দামে গাভী কিনতে পারেন। বাকি টাকা তারা নিজেদের কাজেই ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা অর্থের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি বলে তিনি জানান।
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প সচিব ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই প্রকল্পের প্রতিটি উপকারভোগী সদস্যের মধ্যে ২০ হাজার টাকার সমমূল্যের গাভী (গরু) ক্রয় এবং উন্নতমানের ঢেউটিন ক্রয় করে বিতরণ করার কথা থাকলেও ওই প্রকল্প কর্মকর্তা তা করেননি। ওই প্রকল্প কর্মকর্তা একটি বাড়ি একটি খামারের বরাদ্দ করা অর্থ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে উপকারভোগীরা একাধিক অভিযোগ করেছেন। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উপকারভোগী সদস্য ও পল্লী উন্নয়ন অফিস থেকে জানা গেছে, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল কবীর মুরাদকে আহ্বায়ক ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিমকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রকল্প সচিব রেজাউল করিমের একক সিদ্ধান্তে নিজের লোকজন দিয়ে গত এপ্রিল মাসে সরকারের বরাদ্দ করা টাকা থেকে প্রতি গাভী (গরু) ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় ক্রয় করে ৩০টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পরে ওই প্রতিটি গাভী (গরু) ১৯ হাজার ২০০ টাকা ভাউচার করে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় মিটিংয়ে পেশ করলে সভার অন্য সদস্যরা প্রতিবাদ করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল কবীর মুরাদ জানান, ভ্যাট বাদে ১৯ হাজার ২০০ টাকার নিচে ক্রয়কৃত গরুর মালিককে বাকি অর্থ বিতরণ করার জন্য প্রকল্প সচিবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নরসিংদী : নরসিংদীর শিবপুরে টিআর প্রকল্পে চলছে লুটপাট। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৯ ইউনিয়নে ১৪৪টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৮৭ টন গম ও ২৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে উপজেলা পরিষদ থেকে ৪৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ৮৭ টন গম এবং সংসদ সদস্য বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে ৯৬টি প্রকল্পে ১০০ টন গম ও ২৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিবপুর পৌরসভাসহ ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন মসজিদ, সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, সমবায় সমিতি, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, শ্মশানঘাট, মন্দিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নামে গত অর্থবছর প্রায় ১৬ লাখ টাকা মূল্য মানের ১০০ টন গম গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের (টিআর) জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব বরাদ্দ উত্তোলনের শেষ তারিখ ছিল গত ২৭ জুন, যা এরই মধ্যে দলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ করা হয়নি বলেও জানা গেছে।
শিবপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের নামে পাঁচ টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন তো দূরের কথা, বরাদ্দের ব্যাপারে মসজিদ কর্তৃপক্ষ অবগত নন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর মৃধা নামের এক ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে শিবপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন খান সেজু বলেন, এ মসজিদের নামে বরাদ্দ দেয়ার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। আর মসজিদের উন্নয়নের নামে কোনো বরাদ্দ পায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন মসজিদের ইমাম মো. আশরাফ আলী। জাহাঙ্গীর মৃধা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আঙ্গুর মৃধার ছোট ভাই। তিনি বলেন, ‘আমি মসজিদ কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নই, বাজারে ব্যবসা করি। আমি মসজিদের কোনো টিআর উত্তোলন করিনি। দত্তেরগাঁও মধ্যপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উন্নয়নের নামে দুই মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যার প্রকৃত চেয়ারম্যান হচ্ছেন হান্নান খান, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে আবদুল হাই নামের এক ব্যক্তির নামে।’ এ ব্যাপারে নরসিংদী-৩ আসনের (শিবপুর) স্থানীয় সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুঞা মোহন বলেন, এটা তো আসলে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা করেন। হয়তো ভুল হতে পারে। পরে এটা সংশোধনের ব্যবস্থা করব। এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছোট ভাই জোনায়াইদ হোসেন ভুঞা জুনু বলেন, সব সরকারের আমলেই টিআরের কিছু অংশ স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঘরে যায়, কিন্তু এবার যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বিতরণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার খান বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের তালিকা ও প্রকল্প কমিটি মোতাবেক টিআর বিতরণ করা হয়েছে। টিআর ও কাবিখা পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধানও তিনি। সুতরাং এগুলো দেখার দায়িত্বও তার। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাবু সূর্যকান্ত দাস বলেন, টিআর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মোটাতাজা করার প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা টিআরে অনিয়মের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) : ভুরুঙ্গামারীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিন দিনের মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ করে তার দফতরকে অবহিত করার নির্দেশ দিলেও অদ্যাবধি অধিকাংশ প্রকল্পের কাজের সিকি ভাগও হয়নি। কিন্তু প্রকল্প কমিটি রেজুলেশন করে জানিয়ে দিয়েছে প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। গত ৩০ জুন টাকা উত্তোলনের আগেই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ট্যাগ অফিসাররা সন্তোষজনক কাজ হয়েছে মর্মে মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করার পরই পিআইও অফিস থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থের চেক প্রদান করা হয় প্রকল্প চেয়ারম্যানদের নামে। ডিও এবং চেকে স্বাক্ষর নিয়ে প্রকল্প চেয়ারম্যানদের পরে টাকা বুঝিয়ে দেয়া হবে বলে সদর ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান জানিয়ে দেন।
জলঢাকা (নীলফামারী) : নীলফামারীর জলঢাকায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চলছে লুটপাট। ১ম পর্যায়ে উপজেলার শিমুলবাড়ী, শৌলমারী, ডাউয়াবাড়ী ও কৈমারী—এই ৪টি ইউনিয়নের প্রতিটি সমিতির ৬০ জন করে সদস্য বিভিন্নভাবে বরাদ্দ পান।
এর মধ্যে প্রতি সমিতির ১০ সদস্য ১টি করে গরু, ১০ সদস্য ২ বান্ডিল করে টিন, ১০ সদস্য হাঁস-মুরগির খামার ও বাকি ৩০ জন সদস্য ১ হাজার করে টাকা বৃক্ষ রোপণ ও সবজি বাগানের জন্য বরাদ্দ পাচ্ছেন। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বাজার থেকে গরু ও টিন ক্রয় করেন। আর এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে অতি কম মূল্যে রুগ্ণ কঙ্কালসার গরু ও কম দামি টিন ক্রয় করে সুবিধাভোগীদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে