Wednesday, 10 August 2011

সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়েছেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা  জমি কেরুর, লাভের টাকা দলীয় লোকদের পকেটে


















ছবি: প্রথম আলো
কামরুল হাসান ও শাহ আলম | তারিখ: ১১-০৮-২০১১ | ২১৬

দলীয় পরিচয়ের সুবাদে চাকরি হয় কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে। চাকরিতে ঢুকেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রথম বছর বেনামে ৩৬০ বিঘা জমি ইজারা নেন। এবার নিয়েছেন আরও ১৪১ বিঘা। তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক আবদুল কুদ্দুস। এখন হিজলগাড়ি বাণিজ্যিক খামারের কেরানি। তবে নামমাত্র দরে ইজারা নেওয়া এসব জমি তিনি নিজে আবাদ করেন না। সবই ভাড়া দেন প্রান্তিক চাষিদের কাছে। গত ৩০ জুলাই দুপুরে হিজলগাড়ি খামারে কুদ্দুস নিজের মুখেই বললেন এসব কথা। শুধু কুদ্দুসই নন, তাঁর মতো কেরু অ্যান্ড কোম্পানির অনেক কর্মী এই প্রতিষ্ঠানের জমি ইজারা নিয়ে জমজমাট ব্যবসা ফেঁদেছেন। তবে এসবের কলকাঠি রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। নামে-বেনামে এই নেতা ও কর্মচারীরা নামমাত্র দরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে তা ভাড়া দিচ্ছেন সাধারণ চাষিদের কাছে। এভাবে তাঁরা কামিয়ে নিচ্ছেন বছরে আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু ইজারা নেওয়া জমি ভাড়া দেওয়া বা কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। এদিকে বছরের পর বছর কাঁচামালের অভাবে লোকসান গুনছে এ প্রতিষ্ঠানটি। এই অবৈধ ব্যবসার কথা স্বীকার করেছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম আবদার হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কেরু হলো দুর্নীতির আর্কাইভ, অনিয়মের কোনো শেষ নেই। অবশ্য এখন অনিয়ম কিছুটা দূর হয়েছে। কিন্তু এক দিনে সব দূর করা যাবে না।’ কেরু ও এর সম্পদ: চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রতিষ্ঠান। চিনি কারখানা, ডিস্টিলারি কারখানা ও ওষুধ কারখানা—এ তিনটি বিভাগ নিয়ে ১৯৩৮ সালে এ কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয়। তিনটি শাখার মধ্যে ওষুধ কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন ভিনেগার ছাড়া আর কিছু নেই। চিনিকলটি অলাভজনক হয়ে আছে অনেক বছর ধরে। কারখানার খামার বিভাগ সূত্র জানায়, এ প্রতিষ্ঠানের মোট জমির পরিমাণ নয় হাজার ১৬৮ বিঘা (তিন হাজার ৫৫ দশমিক ৮৪ একর)। এর মধ্যে চাষযোগ্য জমি সাত হাজার ৯২ বিঘা। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় অর্ধেক জমি ইজারা এবং অর্ধেক কোম্পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাষ করা হয়। গত বছর ইজারা দেওয়া হয় তিন হাজার ৪৯২ বিঘা। আর এ বছর ইজারা দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৬০০ বিঘা। আগামী বছরের জন্য নতুন করে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ইজারা হয় যে কারণে: বেশি দিন এক জমিতে আখ ভালো হয় না। তাই জমির ভারসাম্য রক্ষায় অন্য ফসল করতে হয়। এ কারণে এসব জমি স্থানীয় চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারার মধ্যে যাঁরা ১৮ মাসের জন্য ইজারা নেন, তাঁদের জন্য আখ চাষ বাধ্যতামূলক। আর যাঁরা চার, পাঁচ ও ছয় মাসের জন্য নেন, তাঁরা অন্য ফসল করতে পারেন। শর্তানুসারে মিলের জমিত্রেতামাক, পেঁপে, ভুট্টা ও কলা চাষ করা যায় না। অনিয়ম নেই!: কেরু কোম্পানির জমি ইজারা দেওয়ার আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তা ছাপাও হয় স্থানীয় পত্রিকায়। সাধারণ বিবেচনায় কোনো অনিয়মই নেই। তবে এ দরপত্রের ব্যাপারে সাধারণ কৃষকেরা কোনো তথ্যই পান না। অভিযোগ আছে, গোপনে এসব ইজারা হয়ে থাকে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ গোপন বিজ্ঞপ্তির কথা অস্বীকার করেছে। অস্বীকার করলেও বাস্তবতা হলো, কয়েকজন ক্ষমতাশালী বছরের পর বছর কেরুর কয়েক হাজার বিঘা জমি ইজারা নিয়ে ভোগ করছেন। বিগত চারদলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভোগ করতেন মূলত কেরু কোম্পানির সিবিএ নেতারা। বর্তমান সরকারের আমলে সিবিএ নেতাদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। একজন আল মামুন: সদর উপজেলার ছোট শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা ও কেরুর ইক্ষু উন্নয়ন সহকারী (সিডিএ) আবদুল্লাহ আল মামুন এখন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত বছর তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান এম এ এ এম ট্রেডার্সের নামে নিয়েছেন ৩৪২ বিঘা। এ জমির পুরোটাই তিনি আবার ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর অবৈধ দখল থেকে ১০০ বিঘা জমি উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ দখলের বিষয়টি চিনি খাদ্য শিল্প সংস্থার তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নজরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরুর কর্মচারী মামুন ২০০৭ সালে সারাবেলা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রথমে তিন বছর মেয়াদে ২৮৫ বিঘা চাষযোগ্য ও ২১০ বিঘা বাগান করার যোগ্য জমি ইজারা নেন। এ জমি তিনি ভাড়া দেন। আর ইজারার বাইরে অনেক জমি দখল করেন। ২০০৮ সালে তিনি মিম এন্টারপ্রাইজের নামে ২১০ বিঘা জমি ইজারা নেন। এ প্রতিষ্ঠানটি তাঁর শ্যালক শামীম আহমেদের নামে। ওই সময় তিনি ৩৩ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল করেন। এ ছাড়া সরকারি জমিতে ভুট্টার চাষ নিষিদ্ধ করা হলেও তিনি পুরো জমি ভুট্টার আবাদের জন্য বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেন। কেরুর উপমহাব্যবস্থাপক (খামার) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চপর্যায়ের একটি দল তদন্ত করে মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মামুন প্রথম আলোকে বলেন, জমি নেওয়ার সময় তিনি কেরুর কর্মচারী ছিলেন না। কর্মচারী হওয়ার পর আর জমি নেননি। জমি অবৈধ দখলে রাখার কথা অস্বীকার করে বলেন, মাপজোকে ভুল হওয়ার কারণে তাঁর শ্যালকের নামে কিছু জমি বেশি ছিল। সে জন্য তিনি বাড়তি টাকাও দিয়েছেন। মূল নিয়ন্ত্রণ কারা করেন: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরুর জমি ইজারা নিয়ন্ত্রণ করেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সাংসদ আলি আজগার টগর ও তাঁর লোকজন। সাংসদের অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত গোলাম ফারুক আরিফ এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর সঙ্গে আছেন সাংসদের নিকটাত্মীয় ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমানসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী। তবে সদর আসনের সাংসদ ছোলাইমান হক জোয়ার্দার সেলুনের লোকজনও এটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই দরপত্র জমা দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য দর্শনা, দামুড়হুদা ও চুয়াডাঙ্গায় পৃথক বাক্স রাখা হলেও সেখানে কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেন না। দুই সাংসদের লোকজন এসব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পরে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দরপত্র জমা করা হয়। কিন্তু অনেকেই আর দরপত্র জমা দিতে পারেনি। সাংসদের ঘনিষ্ঠ গোলাম ফারুক আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন না। তবে সাংসদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে। এ ব্যাপারে সাংসদ আলী আজগারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি চীন সফরে আছেন। ইজারা পেয়েছেন যাঁরা খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ইজারা হয়েছে তিন হাজার ৬০০ বিঘা জমি। প্রভাবশালী ৩৮ জন এ জমি ইজারা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাংসদ আলী আজগারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ী গোলাম ফারুক আরিফ একাই নিয়েছেন তিনটি খামারে ৩১৮ বিঘা। বিঘাপ্রতি তিন হাজার ৩৪৬ টাকা ৫৬ পয়সা দরে তিনি এ জমি ইজারা নেন। এম এম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয় ১১৫ বিঘা। বিঘাপ্রতি দর মাত্র দুই হাজার ৫০৫ টাকা। জনৈক আবদুর রাজ্জাক নিয়েছেন ৪৬ বিঘা। খালিদ হোসেন নিয়েছেন ১৯ বিঘা। চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান কবির ঘোলদাড়ি বাণিজ্যিক খামারে ৮১ বিঘা জমি এক ফসলের জন্য ইজারা নেন এক হাজার ৬৮৬ টাকা ৮১ পয়সা দরে। যুবলীগের নেতার নামে ওই জমি বরাদ্দ যথাযথ নিয়ম মেনে না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন একই খামারের অন্য একজন ইজারাদার। বেগমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত ডিহি গ্রামের আবদুল মান্নান ৩২৭ বিঘা জমি ইজারা নেন। ইজারার জমি তিনি ভাড়া দিয়েছেন বছরে নয় হাজার টাকা বিঘায়। কেরু কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক ট্রাক্টরের হেলপার ও বড় শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম নিজের নামে নিয়েছেন ২৯১ বিঘা। তাঁর ছেলে আবদুল হালিমের নামে নিয়েছেন ১৮ বিঘা। বোয়ালিয়া ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রের পাহারাদার নেহালপুরের বাসিন্দা মুবারক হোসেন নিয়েছেন ১৯৮ বিঘা। হোগলডাঙ্গার যুবলীগ নেতা শাহীন নিয়েছেন ৯০ বিঘা, তিতুদহের যুবলীগ নেতা আজিজুল হক নিয়েছেন ৬০ বিঘা, সাবেক সিবিএ নেতা ওয়াহিদুর রহমানের ছেলে আলমগীর নিয়েছেন ৫১ বিঘা। আকন্দবাড়ি খামারের কেরানি দর্শনার বাসিন্দা বাবলুর রশিদ ইজারা নিয়েছেন ১১৭ বিঘা। আলমডাঙ্গার আওয়ামী লীগ নেতা বেলু চৌধুরী নিয়েছেন ১৮৯ বিঘা। প্রথম আলোকে তিনি জানান, এ জমি তিনি চাষিদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। কিছু জমি তাঁর ভাইয়েরা আবাদও করেছেন।

Friday, 5 August 2011

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া : ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা : গণধোলাই

রিয়াজ চৌধুরী
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী ঘুষের ৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে রক্ষা পেলেও সংস্থার সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) বিজয় কুমার ঘোষ গণধোলাই থেকে রেহাই পাননি। বেদম মার খেয়ে সোজা হয়ে হাঁটাই এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে না পেরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই তিনিই সুখবোধ করছেন বলে জানা গেছে।
ইইডি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১টায় নিজ দফতরে ঘুষ নিতে গিয়ে সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে ধরা পড়েন বিজয় কুমার ঘোষ। এসময় গণধোলাইয়ের শিকার হন তিনি। পরে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেন। জানা যায়, সম্প্রতি ৩৬ সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তাদের আবার ঢাকায় আনতে জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা (অগ্রিম ১৫ হাজার ছাড়াও কাজ শেষে ১৫ হাজার) ঘুষ দাবি করেন বিজয় কুমার ঘোষ। এদের একজনের কাছ থেকে অগ্রিম ১৫ হাজার টাকা নিতে গিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। এর পরই শুরু হয় গণধোলাই। ধোলাই থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে কোনো ফায়দা হয়নি।
এর আগে গত জুন মাসে সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিম এক ব্যক্তির কাছ থেকে নেয়া ঘুষ ৫ লাখ টাকা ফেরত দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মিজানুল করিম এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেন। পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে তিনি এ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু লোকটি কাজ না পাওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নালিশ করেন। পরে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে ওই ব্যক্তিকে ঘুষের ৫ লাখ টাকা ফেরত দেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইইডি’র এ দুই কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, টেন্ডারবাজদের সঙ্গে সখ্য এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা বহাল তবিয়বে রয়েছেন। শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালী দুই সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ায় সংস্থায় তাদের দাপটের অন্ত নেই। তারা ইইডিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। যারা বেশি দুর্নীতি করতে পারে তাদেরই যোগ্য বলে ধরা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সংস্থার প্রধান প্রকৌশলীর পদটি আগামী ২২ আগস্ট শূন্য হচ্ছে। সংস্থার বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিমের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তৃতীয় বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। এরই মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিতর্কিত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল হুদা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মিজানুল করিমকে তৃতীয় বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে অনুরোধ জানিয়েছেন। জানা যায়, মিজানুল করিম ২০০৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। পরে প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট তিনি প্রধান প্রকৌশলীর পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শেষ হলে কিছুদিন ওই পদ শূন্য থাকে। কিন্তু তিনি ওই পদে কাউকে বসতে দেননি। পরে প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে ২২ আগস্ট আরও একজন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আনেন।
সংস্থার সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) বিজয় কুমার ঘোষের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণধোলাইয়ের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, দু’মাস আগে ৩৬ জনকে বদলি করা হয়েছে। তারা বৃহস্পতিবার আমার কাছে এসে দাবি করে, তাদের ঢাকায় আনতে হবে। আমি তাদের বলেছি, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, আমি কারও কাছ থেকে ঘুষ নেইনি। এটা আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র।
সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী মিজানুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, বৃহস্পতিবার আমি অফিসে ছিলাম না। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে মিটিং ছিল। সেখানে গিয়েছিলাম। বিজয় কুমারের বিষয়টি নিয়ে আমি এখনও ক্লিয়ার নই। তাছাড়া শুক্রবার ও শনিবার অফিস বন্ধ। রোববারে অফিসে গেলে বিষয়টি ক্লিয়ার হওয়া যাবে।

Wednesday, 20 July 2011

সরকারি প্রকল্পের টাকা যাচ্ছে আ’লীগ নেতাকর্মীদের পকেটে













ডেস্ক রিপোর্ট
বিভিন্ন স্থানে সরকারি প্রকল্পের টাকা, গম ও চাল নিয়ে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। কাগজে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি এসব প্রকল্পের টাকা যাচ্ছে আ’লীগের নেতাকর্মীদের পকেটে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, টিআর প্রকল্প ও কাবিখা প্রকল্পসহ সরকারি সব ধরনের প্রকল্পেই এই দুর্নীতি ও লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিস্তারিত খবর পাঠিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।
বাগেরহাট : বাগেরহাট সদর উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ করা গাভী ক্রয়ের টাকার অর্ধেক দামে ক্রয় করা হয়েছে। বাকি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। গত শনিবার এ প্রকল্পের সাড়ে তিন শতাধিক সুফলভোগীর মধ্যে গাভী, টিন, গাছের চারা ও বীজ বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ উপকরণ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর শওকাত আলী বাদশা। জেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা শান্তিরাম দত্ত জানান, গত ৩০ জুন সদর উপজেলার ৭০ জন সুফলভোগীকে ১৯ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয় গাভী ক্রয়ের জন্য। এর আগে আরও ৩০ জনকে একই পরিমাণ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১২০ জনকে বীজ, ৯০ জনকে ২১টি করে গাছের চারা, ১৩০ জনকে হাঁস, ১৪ জনকে টিনসহ মোট ৩৮৪ জনকে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়, যা দিয়ে সুফলভোগীরা ক্রমেই স্বাবলম্বী হবেন।
সরেজমিন শনিবার গাভী ও টিন হস্তান্তর অনুষ্ঠানের সময় টাকাপ্রাপ্তরা যে গাভী এনেছেন তা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে ক্রয় করা গাভী। বরাদ্দকৃত বাকি টাকার কোনো হদিস নেই। এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় সুফলভোগী প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার টাকা। এ থেকে ভ্যাট বাদ দিয়ে প্রত্যেককে ১৯ হাজার টাকা করে দিয়ে তাদের গরু কেনার জন্য বলা হয়েছিল। সুফলভোগীরা নিজেদের পছন্দমত গাভী কিনেছেন। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ হয়তো কিছু কম দামে গাভী কিনতে পারেন। বাকি টাকা তারা নিজেদের কাজেই ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা অর্থের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি বলে তিনি জানান।
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প সচিব ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই প্রকল্পের প্রতিটি উপকারভোগী সদস্যের মধ্যে ২০ হাজার টাকার সমমূল্যের গাভী (গরু) ক্রয় এবং উন্নতমানের ঢেউটিন ক্রয় করে বিতরণ করার কথা থাকলেও ওই প্রকল্প কর্মকর্তা তা করেননি। ওই প্রকল্প কর্মকর্তা একটি বাড়ি একটি খামারের বরাদ্দ করা অর্থ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে উপকারভোগীরা একাধিক অভিযোগ করেছেন। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উপকারভোগী সদস্য ও পল্লী উন্নয়ন অফিস থেকে জানা গেছে, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল কবীর মুরাদকে আহ্বায়ক ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিমকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রকল্প সচিব রেজাউল করিমের একক সিদ্ধান্তে নিজের লোকজন দিয়ে গত এপ্রিল মাসে সরকারের বরাদ্দ করা টাকা থেকে প্রতি গাভী (গরু) ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় ক্রয় করে ৩০টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পরে ওই প্রতিটি গাভী (গরু) ১৯ হাজার ২০০ টাকা ভাউচার করে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় মিটিংয়ে পেশ করলে সভার অন্য সদস্যরা প্রতিবাদ করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল কবীর মুরাদ জানান, ভ্যাট বাদে ১৯ হাজার ২০০ টাকার নিচে ক্রয়কৃত গরুর মালিককে বাকি অর্থ বিতরণ করার জন্য প্রকল্প সচিবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নরসিংদী : নরসিংদীর শিবপুরে টিআর প্রকল্পে চলছে লুটপাট। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৯ ইউনিয়নে ১৪৪টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৮৭ টন গম ও ২৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে উপজেলা পরিষদ থেকে ৪৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ৮৭ টন গম এবং সংসদ সদস্য বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে ৯৬টি প্রকল্পে ১০০ টন গম ও ২৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিবপুর পৌরসভাসহ ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন মসজিদ, সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, সমবায় সমিতি, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, শ্মশানঘাট, মন্দিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নামে গত অর্থবছর প্রায় ১৬ লাখ টাকা মূল্য মানের ১০০ টন গম গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের (টিআর) জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব বরাদ্দ উত্তোলনের শেষ তারিখ ছিল গত ২৭ জুন, যা এরই মধ্যে দলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ করা হয়নি বলেও জানা গেছে।
শিবপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের নামে পাঁচ টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন তো দূরের কথা, বরাদ্দের ব্যাপারে মসজিদ কর্তৃপক্ষ অবগত নন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর মৃধা নামের এক ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে শিবপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন খান সেজু বলেন, এ মসজিদের নামে বরাদ্দ দেয়ার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। আর মসজিদের উন্নয়নের নামে কোনো বরাদ্দ পায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন মসজিদের ইমাম মো. আশরাফ আলী। জাহাঙ্গীর মৃধা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আঙ্গুর মৃধার ছোট ভাই। তিনি বলেন, ‘আমি মসজিদ কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নই, বাজারে ব্যবসা করি। আমি মসজিদের কোনো টিআর উত্তোলন করিনি। দত্তেরগাঁও মধ্যপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উন্নয়নের নামে দুই মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যার প্রকৃত চেয়ারম্যান হচ্ছেন হান্নান খান, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে আবদুল হাই নামের এক ব্যক্তির নামে।’ এ ব্যাপারে নরসিংদী-৩ আসনের (শিবপুর) স্থানীয় সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুঞা মোহন বলেন, এটা তো আসলে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা করেন। হয়তো ভুল হতে পারে। পরে এটা সংশোধনের ব্যবস্থা করব। এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছোট ভাই জোনায়াইদ হোসেন ভুঞা জুনু বলেন, সব সরকারের আমলেই টিআরের কিছু অংশ স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঘরে যায়, কিন্তু এবার যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বিতরণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার খান বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের তালিকা ও প্রকল্প কমিটি মোতাবেক টিআর বিতরণ করা হয়েছে। টিআর ও কাবিখা পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধানও তিনি। সুতরাং এগুলো দেখার দায়িত্বও তার। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাবু সূর্যকান্ত দাস বলেন, টিআর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মোটাতাজা করার প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা টিআরে অনিয়মের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) : ভুরুঙ্গামারীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিন দিনের মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ করে তার দফতরকে অবহিত করার নির্দেশ দিলেও অদ্যাবধি অধিকাংশ প্রকল্পের কাজের সিকি ভাগও হয়নি। কিন্তু প্রকল্প কমিটি রেজুলেশন করে জানিয়ে দিয়েছে প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। গত ৩০ জুন টাকা উত্তোলনের আগেই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ট্যাগ অফিসাররা সন্তোষজনক কাজ হয়েছে মর্মে মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করার পরই পিআইও অফিস থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থের চেক প্রদান করা হয় প্রকল্প চেয়ারম্যানদের নামে। ডিও এবং চেকে স্বাক্ষর নিয়ে প্রকল্প চেয়ারম্যানদের পরে টাকা বুঝিয়ে দেয়া হবে বলে সদর ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান জানিয়ে দেন।
জলঢাকা (নীলফামারী) : নীলফামারীর জলঢাকায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চলছে লুটপাট। ১ম পর্যায়ে উপজেলার শিমুলবাড়ী, শৌলমারী, ডাউয়াবাড়ী ও কৈমারী—এই ৪টি ইউনিয়নের প্রতিটি সমিতির ৬০ জন করে সদস্য বিভিন্নভাবে বরাদ্দ পান।
এর মধ্যে প্রতি সমিতির ১০ সদস্য ১টি করে গরু, ১০ সদস্য ২ বান্ডিল করে টিন, ১০ সদস্য হাঁস-মুরগির খামার ও বাকি ৩০ জন সদস্য ১ হাজার করে টাকা বৃক্ষ রোপণ ও সবজি বাগানের জন্য বরাদ্দ পাচ্ছেন। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বাজার থেকে গরু ও টিন ক্রয় করেন। আর এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে অতি কম মূল্যে রুগ্ণ কঙ্কালসার গরু ও কম দামি টিন ক্রয় করে সুবিধাভোগীদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে
।

Saturday, 9 July 2011

দুর্নীতি : সড়ক ও রেল খাতে অর্থ দিতে চায় না বিশ্বব্যাংক











কাদের গনি চৌধুরী
দুর্নীতির কারণে সড়ক এবং রেল উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতিশ্রুত অর্থ দিতে চাইছে না বিশ্বব্যাংক। ফলে ৩০টিরও বেশি প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার চেষ্টা করেও অর্থছাড় করানো সম্ভব হয়নি। এমন একটি প্রকল্প হচ্ছে রেলওয়ের ‘আখাউড়া- লাকসাম সেকশন ডাবল লাইন নির্মাণ’ প্রকল্প। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে। কিন্তু এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক এ খাতে প্রতিশ্রুত অর্থ দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।সড়ক ও রেল বিভাগের সিনিয়র সহকারী প্রধান এম. এমদাদুল হক সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়াকে লেখা চিঠিতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক আমব্রেলা প্রকল্পের আওতায় ‘আখাউড়া-লাকসাম সেকশন ডাবল লাইন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক থেকে ২২ মে ২০১১ তারিখের চিঠিতে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে মডার্নাইজেশন’ প্রকল্পটির জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সম্ভব হবে না মর্মে অবহিত করে এর যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বলা হয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনটি সম্পূর্ণ ডাবল লাইনে উন্নীত করার গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রকল্পটির জন্য অন্য কোনো আগ্রহী দাতা সংস্থার অর্থায়ন সংগ্রহের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রস্তাব পেশ করেছে। গত ৯ জুন চিঠিটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের হস্তগত হয় বলে সূত্র জানায়। রেলওয়ে সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের জন্য ৮০০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক।
রেলওয়ের আরেকটি প্রকল্প ছিল ধীরাশ্রম (টঙ্গী) আইসিডি উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পটিও বাস্তবায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক এ খাতেও প্রতিশ্রুত অর্থ দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প নেয়া হয় বিশ্বব্যাংকের অর্থ সাহায্যে। ৮৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য বিশ্বব্যাংক ৮শ’ কোটি টাকাও দেয়। পরবর্তী সময়ে শুরুতেই দুর্নীতি দেখে বিশ্বব্যাংক এ টাকা ফিরিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, এ প্রকল্পের জন্য ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয় পরামর্শকের পেছনে। এ অর্থ বিশ্বব্যাংকের দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়নি। বিশ্বব্যাংক অর্থ প্রত্যাহার করে নেয়ায় সরকার নিজস্ব ৯০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ হাতে নেয়। কাজ শেষ করার জন্য ৩০ মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কাজের তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। এমনকি চার অংশে বিভক্ত এই কাজের তিনটি অংশের কাজে হাতই দেয়া হয়নি। রায়মনি থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ২৭ দশমিক ৩২৯ কিলোমিটার অংশে ৩টি সেতু, ৩৫টি বক্স কালভার্ট, ২টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের কথা। কয়েকটি স্থানে পাইলিং কাজ হচ্ছে ধীর গতিতে। কোথাও কোনো মালামাল নেয়া হয়নি। জয়দেবপুর থেকে রাজেন্দ্রপুর অংশে ১২ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার কাজে এখনও হাত দেয়নি ঠিকাদার। সালনা রেলওয়ে ওভারব্রিজ, ২৬টি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কাজ জরুরি হলেও সার্ভের কাজই এখনও শেষ করা হয়নি। যন্ত্রপাতি ও মালামাল নেয়া হয়নি। গাছ অপসারণের কাজেও হাত দেয়া হয়নি। অথচ সওজ কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে অর্থের ৬০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে দিয়েছে। রাজেন্দ্রপুর থেকে মাওনা অংশে ১৭ দশমিক ৬০ কিলোমিটারের কাজও শুরু হয়নি। তারা এখনও বেইজ ক্যাম্প স্থাপন, সড়ক সার্ভে ও গাছ অপসারণের কাজ করেনি। একমাত্র মাওনা থেকে রায়মনি পর্যন্ত ২৯ দশমিক ৬০ কিলোমিটার অংশের কাজ শুরু করা হযেছে। চারটি অংশে বিভক্ত এই কাজে নিয়োজিত চারজন ঠিকাদারের প্রত্যেককে ষাট শতাংশ অর্থ অগ্রিম দেয়ার পরও কাজের হতাশাজনক অগ্রগতিতে মন্ত্রণালয় থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করে সওজ কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার ও সওজের ইঞ্জিনিয়ারদের যোগসাজশেই কাজে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানের সড়ক যোগাযোগ সহজতর ও উন্নত করার জন্যই প্রকল্পটি নেয়া হয়। প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু এ প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের একটি প্রভাবশালী মহলকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এ কাজ বাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়ায় বিশ্বব্যাংক তাদের অর্থ ফিরিয়ে নেয় বলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।এদিকে বহুল আলোচিত পদ্মাসেতু নির্মাণ নিয়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে সরকারের। সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন অর্থমন্ত্রীকে লিখা তিন পৃষ্ঠার চিঠিতে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ আনেন। আবার বিশ্বব্যাংক প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিক স্বচ্ছতা দাবি করেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় এ পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতিশ্রুত প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা দিতে বিশ্বব্যাংক অপারগতা প্রকাশ করেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত হওয়া সাপেক্ষেই তারা এ খাতে ঋণ দেয়ার কথা বলেছে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চল ও জেলার আওতায় সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৩০টিরও বেশি প্রকল্পে অর্থ ছাড় করাই সম্ভব হয়নি।এদিকে অর্থের অভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা এবং এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্তির জন্য জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করাসহ ২৫টি প্রকল্প রয়েছে এ মহাপরিকল্পনায়। বার বার উপস্থাপন করা হলেও এসব প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বিশ্বব্যাংকসহ অন্য উন্নয়ন সহযোগীরা। এদিকে মহাপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পও ফাইলবন্দি হয়ে আছে। এ কারণে ২৬ জুন ঘটা করে উদ্বোধন করা হলেও সুলতানা কামাল সেতু দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারছে না পর্যাপ্ত যানবাহন।সূত্রে জানা গেছে, ১৭টি জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করাসহ ২৫টি প্রকল্পের পরিকল্পনা হাতে নেয় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর। সওজ তার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২৫০ প্রকল্পের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ ২৫ প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে এ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই সরকার প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে যাচ্ছে। জানা গেছে, বিভিন্ন সড়ক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে সড়ক ও সেতু প্রকল্পে অর্থ সাহায্য দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে বিশ্বব্যাংক। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে এসব প্রকল্পে অর্থ চাওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণে এসব প্রকল্প নিয়ে বিপাকে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, ১৭ প্রকল্পের মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও বহদ্দারহাট-তৃতীয় কর্ণফুলী সংযোগ সড়ক চার লেন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এছাড়া নবীনগর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অন্যগুলোর মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প ছক (ডিপিপি) তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পথে। অনেক প্রকল্পে আবার সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। মূল্যায়নের জন্য এগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।জানা গেছে, ১৭ জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা, গাজীপুর-আজমতপুর-ইটাখলা, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা, টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড ও ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা সড়কের ডিপিপি তৈরির কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই ডিপিপি তৈরি হবে ময়মনসিংহ-জামালপুর-শেরপুর, দৌলতদিয়া-মাগুরা-খুলনা, হাটিকামরুল-রংপুর, খুলনা-মংলা সড়কের। টঙ্গী-জয়দেবপুর, হাটিকামরুল-বনপাড়া-রাজশাহী, কাঁচপুর-সিলেট-তামাবিল, বনপাড়া-ঈশ্বরদী, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-যশোর সড়কেরও ডিপিপি তৈরির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। সওজের একটি সূত্র জানায়, এশিয়ান হাইওয়ে, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতেই এসব জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ-এশীয় অঞ্চলের সহ-সভাপতি ইসাবেল গুয়েরেরো অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে করে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এই খাতে তারা আর বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দেন।
তবে বিশ্বব্যাংক দক্ষিণাঞ্চলের নৌ খাতের উন্নয়নে সহায়তা দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এমন অভিযোগ করার পর অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব দুর্নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকও জড়িত। কারণ তারা এসব কাজ অনুমোদন করেছে। এরপরও বিশ্বব্যাংককে এই খাতে অর্থায়ন করার আহ্বান জানান তিনি।

Wednesday, 29 June 2011

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে চরম দলীয়করণ












আসাদুজ্জামান সাগর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত আড়াই বছরে ১৯০ জন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগের বেশিরভাগই হয়েছে দলীয় বিবেচনায়। আর এটা করতে গিয়ে প্রকৃত মেধাবীদের ‘বঞ্চিত’ করা হয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছেন তুলনামূলক কম মেধাবীরা। এমন ঘটনাও রয়েছে—অনার্স-মাস্টার্সসহ শিক্ষাজীবনের সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীপ্রাপ্ত প্রার্থী থাকার পরও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৩২তম স্থান, বিএফএ-এমএফএ পাস প্রার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হওয়ার বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী-এমপি, স্পিকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পুত্র-কন্যা, জামাই ও আত্মীয়দের নিয়োগ দেয়া হয়। এসব নিয়োগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ’৭৩-এর আদেশ পর্যন্তও লঙ্ঘিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট, শিক্ষক সমিতি-ডিনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে থাকতেই নিয়োগে এমন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ করা হয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক নয়, ভোটার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।জানা গেছে, নিয়োগে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নানা সময়ে সিলেকশন বোর্ডের সদস্য, ডিন, সিন্ডিকেট সদস্য, বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশেষজ্ঞ সদস্যরা এর প্রতিবাদ করেছেন—দিয়েছেন ‘নোট অব ডিসেন্ট’। বঞ্চিত অথচ মেধাবী ও যোগ্য একাধিক প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। দুই বঞ্চিত প্রার্থী ন্যায়বিচার পেতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা পর্যন্ত ঠুকে দিয়েছেন। শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশাসনকে স্মারকলিপি, মানববন্ধন, প্রচারপত্র বিলি এবং প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে কৈফিয়ত তলব করার ঘটনাও রয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।এদিকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেরা মেধাবীদের বঞ্চিত করায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ মেয়াদে একাডেমিক ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজনরা। নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর ইমেরিটাস বলেন, এর ফলে দেশ ও জাতি একদা দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়বে। বুদ্ধিবৃত্তির জগতে সৃষ্টি হবে দেউলিয়াপনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও লোকপ্রশাসনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আকা ফিরোজ আহমদ বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে। তখন গোটা জাতিরাষ্ট্রই ধ্বংসের সীমানায় দাঁড়াবে।নিয়োগে অনিয়ম আর দলীয়করণের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রোভিসি এবং প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে সিলেকশন বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ বলেন, এ সবই গতানুগতিক অভিযোগ। মন্ত্রী, এমপি, শিক্ষক বা অন্য কারও বাবার পরিচয় কখনোই নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। একজন যদি যোগ্য হয় আর তাকে বাবার বা দলীয় পরিচয়ের কারণে বাদ দেয়া হয় তাহলে সেটা হবে অন্যায় এবং মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থী। নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত মেধা আর যোগ্যতার বিবেচনা করা হয়। বেশিরভাগ নিয়োগই এই মৌলিক শর্ত মেনে করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ভোটের রাজনীতিকে সামনে রেখে ভোটার নিয়োগের অভিযোগ নিতান্তই গতানুতিক। বরং এই অভিযোগটিই দলীয় বিবেচনাপ্রসূত।বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের এই ১৯০ শিক্ষক নিয়োগে নানা নিয়ম-অনিয়মের ব্যাপারে আমার দেশের পক্ষ থেকে নিজস্ব অনুসন্ধান চালানো হয়। এছাড়া এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, সিন্ডিকেট সদস্য, বিভাগের চেয়ারম্যান, সিলেকশন কমিটির বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগও পাওয়া গেছে।চারুকলা অনুষদ : বর্তমান প্রশাসনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে চরম দলীয়করণ ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৭ বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭ প্রভাষকের ১৫ জনই তুলনামূলক কম যোগ্য, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও নেতাকর্মী এবং বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রপতির দফতর এ অভিযোগ আমলে নিয়েছে। বঙ্গভবনের নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সম্প্রতি দু’দফা কৈফিয়ত তলব করেছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে ২ জন প্রভাষক পদে আবেদন করেছিলেন ১০ প্রার্থী। তাদের মধ্যে নিয়োগ কমিটির তালিকায় প্রথম ২ জন মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ও মো. আতিকুল ইসলামের অনার্স-মাস্টার্সসহ তিনটিতে প্রথম শ্রেণী ছিল। তাদের বাদ দিয়ে নেয়া হয়েছে তালিকায় তৃতীয় ও চতুর্থ নম্বরে থাকা নাসিমুল কবির ও নাসিমা হক মিতুকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারা এসএসসি ও এইচএসসিতে দ্বিতীয় শ্রেণী এবং পাস কোর্সে ডিগ্রি এবং প্রিলিমিনারি মাস্টার্স পাস। অবশ্য ডিগ্রি ও মাস্টার্সে তাদের প্রথম শ্রেণী রয়েছে। বিভাগের শিক্ষক ও নিয়োগ প্রার্থীদের অভিযোগ, অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী পাওয়া প্রার্থী থাকার পরও ডিগ্রি পাস প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে জঘন্য ঘটনা। ওই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে তিনটিতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া এবং ১৯টি পদক পাওয়া প্রার্থী মাহমুদুল হাসান হাইকোর্টে রিট করেছেন। আগামী ১০ আগস্ট এর আদেশ হবে বলে তিনি জানান। এদিকে ওই নিয়োগের বিরোধিতা করে ২৯ জুলাই সিন্ডিকেটের চার সদস্য আপত্তিপত্র দিয়েছেন।ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে ৩ প্রভাষক ও ১ সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও মেধার মূল্যায়ন হয়নি। গুরুত্ব পেয়েছে দলীয় পরিচয়। সিলেকশন কমিটির তালিকার ৩৫ জনের মধ্যে ১ থেকে ৬ নম্বর পর্যন্ত প্রার্থীর এসএসসি, এসএইচসি, অনার্স ও মাস্টার্স—৪টিতেই প্রথম শ্রেণী ছিল। তালিকার ৪ ও ৫ নম্বরে থাকা প্রার্থী সবগুলোতে প্রথম শ্রেণী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ছিলেন। কিন্তু তালিকাবঞ্চিত করে ক্রমিকের ৭ নম্বরের প্রার্থী সহিদ কাজী, ৮ নম্বরে থাকা প্রার্থী আবদুস সাত্তার এবং ৩৩ নম্বরের প্রার্থী দুলাল চন্দ্র গাইনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তালিকার ৩৩ নম্বরে থাকা প্রার্থী দুলাল চন্দ্র গাইনের শিক্ষাজীবনের তিনটিতে দ্বিতীয় শ্রেণী। শুধু মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী রয়েছে। দুলাল চন্দ্র গাইন ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এ অনুষদের ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ৭ নম্বরে থাকা প্রার্থী সহিদ কাজী এবং ৮ নম্বরে থাকা প্রার্থী আবদুস সাত্তারের শিক্ষাজীবনে তিনটি প্রথম শ্রেণী রয়েছে। জানা যায়, দুলাল চন্দ্র গাইন বর্তমান সরকারের সময় কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ময়মনসিংহের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পান। নিয়োগ কমিটির প্রার্থীদের তালিকায় দুলাল চন্দ্র গাইন আবেদনের সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অভিজ্ঞতার কথা গোপন করেন। তাছাড়া অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রার্থী চাকরি করেন তার অনুমতির প্রয়োজন হয়। তিনি সে অনুমতিও নেননি। ২০১০ সালের ২৯ জুলাই সিন্ডিকেট সভায় ওই নিয়োগের বিরোধিতা করে চার সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন, অধ্যাপক ড. তাজমেরী এসএ ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক লুত্ফর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেন। এছাড়া এই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগে এক প্রার্থীকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করে অন্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়। ওই নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ প্রার্থী হোসাইন মোহাম্মদ ফারুক হাইকোর্টে রিট করেছেন। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। প্রিন্ট মেকিং বিভাগে ২ জন প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭ যোগ্য প্রার্থীকে একইভাবে বঞ্চিত করা হয়। এসএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ৪টিতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া ২ প্রার্থী এবং ৩টি প্রথম শ্রেণী পাওয়া ৬ জনের মধ্যে সবগুলোতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া আসমিতা আলম শাম্মীকে নেয়া হলেও বাকি যোগ্যদের বাদ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় জন নেয়া হয়েছে ৩টি দ্বিতীয় শ্রেণী পাওয়া প্রার্থী নাজির হোসেন খানকে। তিনি চারুকলা অনুষদের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ওই নিয়োগের সময় সিলেকশন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল হক এ নিয়োগের চরম বিরোধিতা করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু দলীয় বিবেচনায় নাজির হোসেনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভাগের চেয়ারম্যান ও আমি সভা ত্যাগ করেছিলাম।’গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের নিয়োগ নিয়েও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত ৩ জনের মধ্যে চারটি প্রথম শ্রেণী পাওয়া ভদ্রেশু রিটাকে নেয়া হয়। বঞ্চিত করা হয়েছে দুই যোগ্য প্রার্থীকে। প্রার্থী বিপ্লব কুমার মজুমদারের ৪টি প্রথম শ্রেণী থাকলেও তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। সেখানে নেয়া হয়েছে তিনটিতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া সীমা ইসলাম এবং দুটিতে দ্বিতীয় শ্রেণী পাওয়া হারুন-অর-রশীদকে। সীমা ইসলাম ছাত্রলীগ রোকেয়া হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সিলেকশন বোর্ডে সীমা ইসলামের প্রার্থী বিবরণীতে লেখা ছিল, তিনি অসত্য তথ্য ব্যবহার করেছেন। এ নিয়োগের চরম বিরোধিতা করে সিন্ডিকেট সদস্য তাজমেরী এসএ ইসলাম বলেন, যোগ্য প্রার্থীদের নেয়ার জন্য সুপারিশ করা হলেও তা আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে সিন্ডিকেটের চার সদস্য আপত্তিপত্র দিয়েছিলাম। কিন্তু সিন্ডিকেট সভাপতি ও ভিসি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ওই নিয়োগ দিয়েছেন। প্রাচ্যকলা বিভাগে বিজ্ঞাপনের শর্ত লঙ্ঘন করে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে হিন্দু প্রার্থী কান্তি দেব অধিকারী ও গোপাল চন্দ্র ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বঞ্চিত হয়েছেন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক মাসুদা খাতুন জুঁই। কারুশিল্প বিভাগে এক মেধাবীকে বঞ্চিত করে ফারহানা ও জাহাঙ্গীরকে নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, জাহাঙ্গীরের চেয়ে বঞ্চিত তরুণ নামে প্রার্থী অপেক্ষাকৃত মেধাবী ছিলেন। মৃিশল্প বিভাগে ২ প্রভাষক নিয়োগে মেধার পাশাপাশি দলীয় বিবেচনার বিষয়টি তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কৈফিয়ত তলব : গত বছর ১১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে প্রভাষক পদে নিয়োগে অনিয়ম’ শিরনামপত্রে অভিযোগের কৈফিয়ত তলব করা হয়। ওই তলবের পর তিন মাস পার হলেও মঞ্জুরি কমিশন ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কোনো জবাব না পেয়ে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি ফের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে কৈফিয়ত তলব করেছে।কলা অনুষদ : কলা অনুষদের ১৩ বিভাগে ৩৮ প্রভাষক ও ৩ সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বিভাগে ৪, পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজে ২, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ৫, আরবিতে ৫, ইতিহাসে ২, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে ১, ইংরেজিতে ২, সঙ্গীতে ২, ভাষাবিজ্ঞানে ৩, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতিতে ১, ইসলামিক স্টাডিজে ২, দর্শনে ৫ এবং নাট্যকলায় ৪ জন। ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে নিয়োগ পাওয়া ৩ প্রভাষকের মধ্যে খন্দকার খায়রুন্নাহার নামে জনৈক প্রার্থীর নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও যোগ্যদের বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে। পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজে জগন্নাথ বড়ুয়াকে বঞ্চিত করে নীরু বড়ুয়াকে নেয়া হয়েছে। নীরু বড়ুয়া ওই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিমান চন্দ্র বড়ুয়ার স্ত্রী। যার অনার্সে মাত্র ৪৬ শতাংশ নম্বর রয়েছে। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে মামুনুর রশীদ, আবু সাঈদের মতো বেশ ক’জন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তাদের বাদ দিয়ে অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৩২তম স্থান পাওয়া মো. আবদুর রহিমকে নেয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি আবার সহকারী অধ্যাপক পদে প্রমোশনও পেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৩২তম এবং ১৯৯৭ সালে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী পেয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের আগে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, শুধু দলীয় পরিচয় না থাকায় মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা বাদ পড়েছেন। ওই নিয়োগের প্রতিবাদে সিলেকশন বোর্ডে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন।ইতিহাস বিভাগে ফলাফলের দিক থেকে বেলাল হোসেন ও নাসির উদ্দিন এই ২ জনকে বঞ্চিত করে রেজাউল করিমকে নিয়োগ দেয়া হয়। ইংরেজি বিভাগে এক প্রভাষক ও এক সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজি বিভাগে ড. সামসাদ মর্তুজাকে সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরবি বিভাগে নিয়োগ পাওয়া ৫ শিক্ষকের মধ্যে ৩ জনকে মেধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসরণ করে নিয়োগ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে জহিরুল ইসলাম ও বেলাল হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও মাস্টার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় একই সময়ে মাদ্রাসা থেকেও ফাজিল ও কামিলে অধ্যয়ন ও পরীক্ষা দেন। আইন অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত অবস্থায় অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করতে বা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন না। এক মেধাবীকে বঞ্চিত করে বাংলা বিভাগে ৪ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। দর্শন বিভাগে ৫ প্রভাষক এবং ১ সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে মন্দিরা নামে এক হিন্দুসহ ৩ জনকে দলীয় বিবেচনায় নেয়া হয়। এছাড়া ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ২, নাট্যকলায় ৪, ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নে ১ এবং সংগীত বিভাগে ২ জনকে মেধা ও দলীয় উভয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদ : এ অনুষদের তিন বিভাগে ১৩ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। ৫ যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস ও কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৭ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অজুহাত দিয়ে এমএল পলাশ অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ১৮তম, মাস্টার্সে ১৯তমকে নিয়োগ দেয়া হয়। অনার্সে ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান প্রাপ্ত ফারজানা ফেরদৌস, জাকির হোসেন, সাহারুজ্জামান, তাফসীর উদ্দিন সুমন, নাসিডকে বঞ্চিত করে ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে ৩ প্রভাষক দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দলীয় এ বিবেচনায় ভাগ্য নির্ধারণ করে প্রভাষক হন মিঠুন সরকার, তাসলিমা ফেরদৌস ও সুমাইয়া ফারহানা কবির। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৫ম ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে ২য় ইব্রাহিমকে বাদ দিয়ে ৩ প্রভাষক নেয়া হয়েছে। জীববিজ্ঞান অনুষদ : এ অনুষদের ৬টি বিভাগে ১৬ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ২য়, মাস্টার্সে ১ম স্থান প্রাপ্ত প্রার্থীকে বঞ্চিত করে মত্স্য বিজ্ঞান বিভাগে দলীয় বিবেচনায় ৩ জনকে প্রভাষক নিয়োগ নেয়া হয়েছে। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে ৩ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনার্সে চতুর্থ এবং মাস্টার্সে প্রথমস্থান অধিকারী প্রার্থীকে বঞ্চিত করে অনার্সে ১৭তম ও মাস্টার্সে চতুর্থতম সনিয়া তামান্নাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগের বিরোধিতা করে সিলেকশন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক লায়লা নুর ইসলাম আপত্তিপত্র দেন। জিন প্রকৌশল ও জীব-প্রযুক্তি বিভাগে ৩টি প্রভাষক পদে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে কয়েকজনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মেধার অনুসরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত ছন্দা কর্মকারকে বঞ্চিত করে পুরোপুরি দলীয় বিবেচনায় ২ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। অনুজীববিজ্ঞানে ২ শিক্ষককে দলীয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রাণীবিদ্যায় ৩ জনকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হলেও তারা যোগ্যতা সম্পন্ন ছিল। আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদ : এ অনুষদের দুটি বিভাগে ৫ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে ২ জনকে প্রভাষক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। এক যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে ভূতত্ত্ব বিভাগে একটি হল শাখার ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমানসহ ৩ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। বিজ্ঞান অনুষদ : এ অনুষদের ৬ বিভাগে ১৬ প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়। পদার্থ বিজ্ঞানে ৪; গণিতে ৩; পরিসংখ্যানে ৫; তাত্ত্বিক পদার্থে ২; বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ১ এবং রসায়নে ১ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। পদার্থ বিজ্ঞানে ২ প্রভাষক ও ২ সহকারী অধ্যাপককে সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ১ম, মাস্টার্সে ৩য় রুহুল আমিন; অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৩য়, মাস্টার্সে ৪র্থকে বাদ দিয়ে নেয়া হয়েছে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৮ম, মাস্টার্সে ৬ষ্ঠ স্থান প্রাপ্ত কাজী হানিয়াম এবং অনার্সে ৩য়, মাস্টার্সে ৪র্থ রতন চন্দ্র ঘোষকে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের শর্ত লঙ্ঘন করে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে স্বপন কুমার ঘোষকে। বিজ্ঞাপনের শর্তে সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ্যতা হিসেবে সাত বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও ঘোষের একদিনেরও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল না। এক্ষেত্রে বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রার্থী সাদত হোসেন, সাহাবুল আলম শর্ত পূরণ করলেও তাদের বিজ্ঞাপিত পদের অতিরিক্ত নেয়া হয়েছে। গণিত বিভাগে এক যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে ৩ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম মুহিবুজ্জামানকে বঞ্চিত করে সোহানা জাহানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফার্মেসি অনুষদ : এ অনুষদের দু’টি বিভাগে ৮ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগে দু’জনকে বঞ্চিত করে ৫ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ২য়, মাস্টার্সে ১ম আবদুল্লাহ আল মারুফ এবং অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৩য়, মাস্টার্সে ২য় ইসরাত জাহানকে বাদ দিয়ে নেয়া হয়েছে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ১১তম, মাস্টার্সে ২য় আব্দুল মুহিত এবং অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৮ম, মাস্টার্সে ৬ষ্ঠ আহসানুল আকবরকে। ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৪র্থ, মাস্টার্সে ১ম মো. গিয়াস উদ্দিন এবং অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে ৫ম, মাস্টার্সে ১ম সাদিয়া আফরিনকে বঞ্চিত করে ৩ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ : এ অনুষদের ৬ বিভাগে ২১ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে ৬, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ৪, নৃবিজ্ঞানে ৫, উইমেন জেন্ডার স্টাডিজে ৩, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ২ প্রভাষক এবং লোক প্রশাসনে ১ সহকারী অধ্যাপক।অর্থনীতি বিভাগে ৬ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়। এরমধ্যে অর্চি মধুবীমা বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আতিউর রহমানের মেয়ে। অর্চি মধুবীমা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেলেও শেষ পর্যন্ত যোগদান করেননি বলে জানা গেছে। লোক প্রশাসন বিভাগে নুসরাত জাহান চৌধুরীকে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও অন্য যোগ্য প্রার্থীরা বাদ পড়েছেন। এর প্রতিবাদে সিলেকশন বোর্ডে নোট অব ডিসেন্ট দেন বিভাগের চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য। বঞ্চিত হন তার চেয়ে যোগ্য প্রার্থী শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের প্রভাষক সাইফুদ্দিন আহমদ ও সাবের আহমেদ চৌধুরী। নৃবিজ্ঞান বিভাগে ৫ প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সিলেকশন কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রাপ্ত সৈয়দ আরমান হোসেন, ফারিবা আলমগীর ও জোবাইদা নাসরীনের চেয়ে ৩/৪ জন অধিক মেধাবী প্রার্থী ছিল। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জাহাঙ্গীনগর থেকে পাস করা ও সাবেক এনজিও কর্মী জোবাইদা নাসরীনকে নেয়া হয়। ওই নিয়োগের বিরোধিতা করেছেন সিলেকশন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য ও শিক্ষকরা।। প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে খাতির থাকায় তিনি এ নিয়োগ পান। নিয়োগের পর তিনি বিভাগে এতোই প্রভাব বিস্তার করছেন যে, সিনিয়র শিক্ষকরা পর্যন্ত অস্বস্তিতে রয়েছেন।ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ : এই অনুষদের ৮ বিভাগে ৩৫ প্রভাষক ও ২ সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে মার্কেটিং-এ ২ সহকারী অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্টে প্রভাষক ৩, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ৬, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে ৪, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমে ৬, ফাইনান্সে ৯ এবং ব্যাংকিং-এ ৪ প্রভাষক নিয়োগ পেয়েছেন। মার্কেটিং বিভাগে ২ সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ কোটায় আতাউর রহমানকে নিয়োগের শর্তই লঙ্ঘন করা হয়। নিয়োগের শর্তে চার বছর মেয়াদি বিবিএ এবং এমবিএ চাওয়া হলেও আতাউর রহমান ছিলেন বিকম ও এমকম পাস। বিকমে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ২৪তম স্থানে ছিলেন। ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে ৩ প্রভাষক ও ১ সহকারী অধ্যাপককে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে সহকারী অধ্যাপক পদে ফুলব্রাইট তাহমিনা খানমকে সুপারসিট করে সুমন দাসকে নেয়া হয়েছে। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদের আত্মীয় বদরুজ্জামানসহ ৬ প্রভাষককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাকি ৫ জন হলেন সালমা আক্তার, নুসরাত জাহান, মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সন্তোষ কুমার দেব ও মো. কামরুল হাসানকে মেধার পাশাপাশি দলীয় বিবেচনায় ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত ৬ জনের মধ্যে একজনকে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনার্সে সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৪ এবং মাস্টার্সে ৩. ৯৬ পাওয়া বঞ্চিত প্রার্থী ইশতার মহল প্রতিকার চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে বিচার দিয়েছে। তার বিচার আবেদনের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে ৪ প্রভাষকের ৩ জন দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে আশীষ তালুকদার হিন্দু, কেএম সালাউদ্দিন ছাত্রজীবনে একটি হল শাখার ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। মো. আকরাম হোসেনও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পান। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসে ৩, ফিন্যান্সে ৯ এবং ব্যাকিং-এ ৩ প্রভাষকের ক্ষেত্রে মেধার সঙ্গে দলীয় বিবেচনা নিয়োগপ্রাপ্তদের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে।শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট : শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ১১ জনকেই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জ এলাকার বলে নিজেকে পরিচয় দেয়া মোহাম্মদ আশরাফ সাদেক, কুমিল্লার একটি কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার হায়দার, প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের আত্মীয় পরিচয়ে সুমেরা আহসান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে ইনস্টিটিউট থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা মাহাবুব রহমান পুরোপুরি দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া শিক্ষাজীবনে ৪টিতে প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত শিল্পী হালদার ও বদরুল আলমকে বাদ দিয়ে অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণী প্রাপ্ত তাপস কুমার বিশ্বাস, অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণী প্রাপ্ত দেবদাস হালদারকে নিয়োগ দেয়া হয়। বিজ্ঞানে কম্পিউটার সায়েন্সের একটি পদে নিয়োগের কথা থাকলেও তা না নিয়ে বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তি পদের ১টি করে পদের জায়গায় ২ জন নেয়া হয়। এরা হলেন শারমিন কবীর ও তামান্না সুলতানা। ইনস্টিটিউটের শিক্ষকদের অভিযোগ, বোর্ড অব গভর্নিং (বিওজি) বডি থেকে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়ে দলীয়ভাবে তা গঠন করে এ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট : সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটে ৩ প্রভাষক এবং ১ সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং গোল্ড মেডেল পাওয়া মুস্তাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন প্রার্থীকে বঞ্চিত করে প্রভাষক পদে মইনউদ্দিন মোল্লা, অনুরাধা বর্ধন ও আশরাফুল ইসলাম এবং সহকারী অধ্যাপক সাহানা নাসরীনকে নেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, মইনউদ্দিন ও অনুরাধাকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের মাস্টার্সের ফলাফল দু্রত প্রকাশ করতে শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করিয়ে নেন। সাহানা নাসরীন পরিচালকের ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটে দলীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে বোর্ড অব গভর্নর (বিজি) বডিকে পুরো দলীয়ভাবে গঠন করা হয়। এছাড়া ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউটে ৪, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে ২ প্রভাষক নিয়োগে মেধার সঙ্গে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ : নিয়োগে অনিয়ম, দলীয়করণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত প্রশাসনের প্রো-ভিসি ও সিলেকশন বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার বলেন, আমি যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে শিক্ষক নিয়োগে মেধার চেয়ে দলীয় বিবেচনাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যে সিলেকশন কমিটি করা হয়েছে, তা কট্টর দলীয় সদস্যের সমন্বয়ে করা হয়েছে। অনিয়ম বন্ধে সক্রিয় ও কার্যকর প্রতিবাদ না হওয়ায় এ অনিয়ম হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার প্রশাসনের সময় দলীয়করণের অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক হায়দার বলেন, দলীয় বিবেচনায় একটা নিয়োগও হয়নি। আমরা নিয়োগ দিয়েছি মেধার ভিত্তিতে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি প্রার্থীর কোনো দলীয় মতাদর্শ থাকে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন ও সিন্ডিকেট অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন বলেন, অযোগ্যদের দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের একমাত্র কারণ ভোটের রাজনীতি। পরিকল্পিতভাবে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয় এবং নিয়োগ পরবর্তীতে ৯০ শতাংশকে দলের কট্রোলে নিয়ে আসা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রশাসন মেধাবীদের প্রতি অবিচার করে তাদের আশা ও স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। তিনি অতীত ইতিহাস স্মরণ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন ’৭০-এর দশকে ফিরে গেছেন। ’৭৩-এ প্রচুর দলীয় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। গত প্রশাসনের সময় দলীয়করণের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, অতীতে অনিয়ম হয়ে থাকলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ভিসি’র বক্তব্য : নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও সিলেকশন বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান নবায়নের ক্ষেত্র। এই নবায়ন মেধাবী, নবীন ও তরুণ গবেষকরাই করবে। বিশ্বে ও সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একই সংস্কৃতি। আর এ দর্শনকে সামনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ও বিধি-বিধান অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রশাসনের আড়াই বছরে যেসব নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই হয়েছে।

মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ দেয়া ১৯০ জনই ভুয়া





শামসুস সালেহীনমুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেয়া ১৯০ জনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তারা মুক্তিযোদ্ধার জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। ১৯৭১ সালে ১৯০ জনের অনেকেই ছিলেন দুধের শিশু। তখন তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মায়ের কোলে। মুজিবনগর কর্মচারী কোটায় সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরি পাওয়া ১৯ জনকে এরই মধ্যেই সাসপেন্ড করা হয়েছে। আরও ১১ জনকে সাসপেন্ড করার লক্ষ্যে তাদের নাম পাঠানো হয়েছে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতামতের জন্য। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ে ২০০৯ সালে ১৯০ জনকে মুজিবনগর কর্মচারী কোটায় চাকরি পাওয়া কর্মকর্তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বয়স ছিল ৩ থেকে ৭ বছর। চাকরি দেয়ার সময় তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, মুজিবনগর কর্মচারীরা কেউ কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে পানি খাইয়েছেন, এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে খবর পৌঁছানো ইত্যাদি নানান কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন ছিলেন তিন বছরের শিশু। সে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের পানি খাওয়ালেন অথবা খবর পৌঁছালেন এই নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বিস্মিত হয়েছেন। ওই সময়ের এমন শিশু অনেক রয়েছেন, যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধার কোটায় চাকরি পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মামলায় যে যার মতো নাম বসিয়ে উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার আমার দেশকে জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নয় এমন ১৯০ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে মোট ৫৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। এদের মধ্যে আছেন নকলনবিস, দলিল লেখক, হোমিও চিকিত্সক, পল্লী চিকিত্সক, শিক্ষক, মুদি দোকানি ইত্যাদি পেশার মানুষ। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে সাব-রেজিস্ট্রার পদে আত্তীকরণকৃতদের মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিবন্ধন অধিদফতরের বর্তমান মহাপরিদর্শক (আইজিআর) মুন্সী নজরুল ইসলামের নিজ জেলা নড়াইল ও বরিশালের। অন্য জেলার মাত্র দু’একজন রয়েছেন। গত ১৯ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি ও অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কমিটির সভা হয়। সভায় মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ১৯০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে নিয়োগের অভিযোগ তোলা হয়। এটা বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি করতে বলে সংসদীয় কমিটি ২০০৯ সালের ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করেছে বলে সূত্র জানায়। সভায় আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া সাব-রেজিস্ট্রারদের ৩ জনকে প্রথম সাসপেন্ড করা হয়। তারা হলেন হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার আবুল বাশার, যার জন্ম তারিখ ১৯৬৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার চাকরিতে যোগদানের তারিখ ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর। বরগুনার পাথরঘাটার সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল হকের জন্ম তারিখ ১৯৬৮ সালের ১৫ জুন। তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর। ভোলা জেলার রাধাবল্লভের সাব-রেজিস্ট্রার বাদল কুমার বিশ্বাসের জন্ম ১৯৬৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর। ভূমি রেজিস্ট্র্রেশন বিভাগেও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো অনেক সাব-রেজিস্ট্র্রার অবসরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবার চাকরিতে ফিরেছেন। দুই বছর চাকরির মেয়াদ বাড়ার সুযোগে তারা ভালো সাব-রেজিস্ট্র্রি অফিসে পোস্টিং নিয়ে ঘুষসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ দেখিয়ে তারা চাকরির মেয়াদ দু’বছর বাড়িয়ে নেন। পাশাপাশি অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারা এটাকে সরকারের একপেশে সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এটা প্রশাসনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনে এক সময়ের উচ্চমান সহকারী পরবর্তীতে মুজিবনগর স্টাফ কোটায় সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদানকারী আই,জি,আর, (চলতি দায়িত্ব) মুন্সী নজরুল ইসলাম। তার আপন ছোটভাই প্রায় তিন বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। অথচ আই,জি,আর পদে জুডিশিয়াল সার্ভিস থেকে জেলা জজ বা যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মুন্সী নজরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দু’বছর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে আই,জি,আর-এর পদ দখল করে আছেন। প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে আদালতের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করেছেন মাসদার হোসেন। তিনি আইজিআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দুই মাস। ২০০৭ সালের ১২ এপ্রিল থেকে একই বছরের ৩ জুন পর্যন্ত আইজিআর-এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে আইজিআর-এর চলতি দায়িত্ব পালন করছেন মুন্সী নজরুল ইসলাম। তার ভাতিজা বর্তমানে কর্মরত ঢাকার সদর সাব-রেজিস্ট্রার মুন্সী রুহুল ইসলাম। তারা চাচা-ভাতিজা দু’জনেই মুজিবনগর সরকারের উদ্বৃত্ত হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। ভাতিজা মুন্সী রুহুল ইসলামের জন্ম হয় ১৯৫৯ সালের ৩০ নভেম্বর। অর্থাত্ ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ পর্যন্ত তার বয়স ১১ বছর ৩ মাস ২৬ দিন। চাকরিতে চাচা আইজিআর মুন্সী নজরুল ইসলাম সাব-রেজিস্ট্র্রার পদে যোগ দেন ১৯৭৮ সালের ১০ অক্টোবর। পাশাপাশি ঢাকা সদরে মুন্সী রুহুল ইসলাম সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগ দেন ১৯৯৭ সালের ২৩ জুলাই। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন মেয়াদে নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) পদে দায়িত্ব পালন করেন ২৭ জন। সাব-রেজিস্ট্রার মাত্র দু’জন আইজিআর (মহাপরিদর্শক, নিবন্ধন অধিদফতর) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তদের একজন এ,ওয়াই,এ,ম, আনোয়ারুল হক এবং বর্তমানে এই পদে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন মুন্সী নজরুল ইসলাম। মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে সাব-রেজিস্ট্রার পদে ২০০৯ সালে ১৯০ জন ছাড়া আরও ৮০ জন সাব-রেজিস্ট্রার দেশের বিভিন্নম্ন সাব-রেজিস্ট্র্রি অফিসে কাজ করছেন। তাদের অনেকেই অবসরে চলে গেছেন। যাদের বয়স মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ থেকে ১০ বছর ছিল। ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ দু’টি সাব-রেজিস্ট্র্রি অফিসে রয়েছেন, তাদের একজন বর্তমান আইজিআরের আপন ভাতিজা মুন্সী রুহুল ইসলাম। অপরজন হলেন তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্র্রার আবুল কালাম আজাদ। তার জন্ম তারিখ ১৯৬০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি এই পদে যোগ দিয়েছেন ১৯৯১ সালের ২ মার্চ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তারা দু’জনই মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন না বা মুক্তিযুদ্ধে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। অথচ তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ দাখিল করেছেন কর্মস্থলে।মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বা সহায়তার নামে যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই ভুয়া। জাল সনদ ও কাগজপত্র দাখিল করে এবং প্রকৃত তথ্য গোপন করে তারা সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরি পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশেরই মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল ৩ থেকে ১১ বছর। এ ব্যাপারে নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) মুন্সী নজরুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলবেন না

শীতলক্ষ্যা নদীর মাটি কেটে বিক্রি করছেন প্রভাবশালীরা










সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
সিদ্ধিরগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা ও বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কয়েকদিন ধরে তারা সিদ্ধিরগঞ্জের আটি মৌজার সোহরাব অয়েল মিল ও মনোয়ারা জুট মিলের পাশে, সাইলো এবং আদমজী ইপিজেডের পেছনে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। এলাকাবাসী জানায়, মাটিগুলো বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়।এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর দেয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জনৈক শাহজাহান প্রধান বাদল ওরফে শাহজালাল বাদল, নুরুজ্জামান জজ, ডা. শহীদুল্লাহ, জাহাঙ্গীর হোসেন, এম এইচ মনির, খোকন দেবনাথ ও বাসেদ মিয়া আটি মৌজা দখল করে বালুর ব্যবসা করে আসছেন। চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু আটি মৌজায় সরেজমিন গিয়ে কোনো ধরনের বালু ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। উপরন্তু আটি মৌজায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করে দিচ্ছেন প্রভাবশালীরা। একইভাবে সাইলো গোডাউন ও আদমজী ইপিজেডের পূর্বপাশের মাটি কেটে ট্রলার দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সরেজমিন আটি এলাকায় গিয়ে ট্রাক ও ট্রলারে মাটি কেটে নিতে দেখা গেছে। মাটি কাটায় নিযুক্ত লেবার এবং প্রভাবশালীদের নিযুক্ত বিপ্লব নামের এক যুবক জানায়, বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আলমগীর কবির, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়া ও প্রচার সম্পাদক তাজিম বাবু এই মাটি কাটাচ্ছেন। প্রতি ট্রাক মাটি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। গত ক’দিন ধরে মাটি কাটার ফলে বড় ধরনের ডোবার সৃষ্টি হয়েছে শীতলক্ষ্যা নদীর ওই অংশে। এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র চিঠিতে যে ৭ জনের নাম উল্লেখ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দেয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক (বন্দর) আলমগীর কবির আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অংশীদারিভিত্তিতে শীতলক্ষ্যার মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়ার অবৈধ প্রস্তাব আমরা প্রত্যাখ্যান করায় আলমগীর তার অফিসার সাইফুল ইসলামকে দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, কোনো সত্যতা পাওয়া না যাওয়ায় ওই মামলা রেকর্ডভুক্ত হয়নি। শীতলক্ষ্যা নদীর মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়ার ব্যাপারে আলাপ করলে বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক (বন্দর) আলমগীর কবির জানান, আমি ইঞ্জিনিয়ার পাঠিয়ে মাটি কাটার ব্যাপারে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করে ব্যবস্থা নেব। অপরদিকে এলাকাবাসী জানায়, অপরিকল্পিতভাবে শীতলক্ষ্যার তীরের মাটি কাটায় ছোট-বড় ডোবা সৃষ্টি হলে বর্ষা মৌসুমে শীতলক্ষ্যার তীর ভেঙে আস্তে আস্তে মাটিগুলো শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝপথে গিয়ে পড়বে। এতে শীতলক্ষ্যা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে। এমনকি নৌযানগুলো চলতে গিয়ে বাধার সৃষ্টি হতে পারে। প্রভাবশালীদের নিযুক্ত যুবক বিপ্লবের কাছে মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে কি-না জানতে চাইলে সে জানায়, লিখিত কোনো অনুমতি নেই। তবে মাটি কাটার জন্য ডিসি অফিস থেকে মৌখিক অনুমতি নেয়া হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়া নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন
।